প্রকাশ : শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৭
নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ রইল না
নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ রইল না

প্রথম নিউজ প্রতিবেদক : মাটির ব্যাংক যুগে ফিরে যাওয়াই ভালো।নিজের মালিকানার ব্যাংক, নিজেই চেয়ারম্যান।ইচ্ছে হলে বউকে এমডি এবং পুত্র কন্যাদের ডিরেক্টর বানাতে পারেন।

 

এই ব্যাংকে টাকা রাখতে কাউকে কর দিতে হবে না।টাকা বেশি থাকলে বড় কলসি বা পাতিল কিনে নিতে পারেন।একদা বড় বড় পাত্রে টাকা রেখে মাটিতে পোঁতা হতো।

 

এখনো তা মাটি খুঁড়ে মাঝেমধ্যে পাওয়া যায়।আমরা বলি যক্ষের ধন।কলসি আর পাতিলে টাকা ভরে মাটির নীচে রাখুন, যক্ষ বনে যান।

 

হাসান নাসিরের এই স্ট্যাটাস কৌতুকের মতো শোনালেও বাস্তবিক অবস্থা তাই দাঁড়িয়েছে।

 

নতুন অর্থবছরে (২০১৭-১৮) ব্যাংকে জমার ওপর বাড়তি কর বসানোর ফলে অনেকে ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরুত্সাহিত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের পর এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও হচ্ছে।

 

বিশেষ করে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের ওপর এর প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী বছরের যে কোনো সময় ব্যাংক হিসেবে এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জমা দিলে বা উত্তোলন করলে আটশ টাকা আবগারি শুল্ক কেটে রাখা হবে।

 

যা আগে ছিল পাঁচশ টাকা।একইভাবে ১০ লাখ থেকে এক কোটি পর্যন্ত টাকার ক্ষেত্রে কেটে রাখা হবে আড়াই হাজার টাকা।আগে যা ছিল দেড় হাজার টাকা।এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার জন্য কাটা হবে ১২ হাজার টাকা।

 

কয়েকজন ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর সাথে কথা বললে তারা জানান, এমনিতে বর্তমানে ব্যাংকে সুদের হার অনেক কম।এরপরও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে তারা ব্যাংকে টাকা রাখছেন।আবগারি শুল্ক বাবদ আটশ টাকা কেটে রাখা হলে বছরান্তে লাভ কিছুই হবে না।

 

উল্টো লোকসান হবে।জীবনের সঞ্চয় থেকে এক লাখ টাকা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখেছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাহাদাত হোসেন।

 

তিনি জানান, স্বল্প পুঁজির লোকদের বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুব সীমিত।এক্ষত্রে তারা ব্যাংকে আমানত রেখে কিছু মুনাফা পান।সরকার যদি এতগুলো টাকা কেটে রাখে তাহলে তারা যাবে কোথায়?

 

এদিকে ব্যাংকের অপর ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী সোহরাওয়ার্দী জানান, একসময় স্বল্প পুঁজির লোকজন তাদের অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতো।কিন্তু কয়েক দফা পুঁজি খোয়ানোর পর তারা এখন শেয়ারবাজার বিমুখ।

 

অর্থমন্ত্রী অমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বসিয়ে আমানতকারীদের শেয়ারবাজারের দিকে ঠেলে দিতে চান।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দেশে মোট ৩৩ লাখ ৬২ হাজার ৯১৪টি হিসাব রয়েছে।দুই থেকে তিন লাখ টাকার হিসাব রয়েছে ১৩ লাখ ৮০ হাজারের ওপরে।

 

তিন থেকে চার লাখ টাকার হিসাবের সংখ্যা প্রায় আট লাখ।চার থেকে পাঁচ লাখের হিসাব পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার।পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকার হিসাব ১২ লাখ ১৭ হাজার।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, সঞ্চয়ের বিনিময়ে প্রাপ্ত সুদ মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে বেশি হতে হয়। অন্যথায় টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সঞ্চয়কারীকে লোকসান গুণতে হয়।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদ ৫ দশমিক ১ শতাংশ।আর মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাত্ এক বছরে ব্যাংকে রাখা টাকার ক্রয়ক্ষমতা যতটুকু কমছে সে পরিমাণ সুদও পাচ্ছেন না আমানতকারী।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ব্যাংকের সামগ্রিক আমানতের প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমেছে। যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ।

 

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একজন শীর্ষ নির্বাহী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ব্যাংক হিসেবের ওপর আবগারি শুল্ক বসানোর ফলে ব্যাংকের আমানত উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

 

এতে সমস্যায় পড়বে ব্যাংকগুলো।আমানত কমে গেলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে আসবে বলেও জানান তিনি।