Wednesday, ১৬ আগষ্ট, ২০১৭

জিয়া তোমায় ভূলবে না এ জাতি কো ন দি ন ও না !

মে ৩০, ২০১৭ 14415 views 0
জিয়া তোমায় ভূলবে না এ জাতি কো ন দি ন ও না !

সায়েক এম রহমান :

বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নাম, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’। যার মাত্র ৪ বৎসরের শাসনামলের সুনাম ও সুখ্যাতি বিকশিত হয়ে আছে সমগ্র দুনিয়া জুড়ে। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, ৭১ এর রনাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, ‘জেড ফোর্সের’ অধিনায়ক, বীর উত্তম, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক,  বাংলাদেশের স্বাধীনতা পদকের প্রবর্তক, সার্কের সপ্নদ্রষ্টা, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। আজ তাহার শাহাদাৎ বার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।

 

পাঠক, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালে ১৯শে জানুয়ারী বগুড়ার বাগ বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম ছিল ‘কমল’। তাহার পিতা ও মাতার নাম যথাক্রমে মরহুম মনসুর রহমান ও জাহানার খাতুন।

 

প্রাথমিক লেখাপড়া করেন কলকাতা হেয়ার স্কুলে এবং মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক করেন করাচীতে। ১৯৫৩ সালে সামরিক বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন এবং উচ্চতর শিক্ষা পিএস সি করেন কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে।

 

১৯৬৫ সালে কোম্পানী কমান্ডার হন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, খেমরান সেক্টর। ১৯৬৬ সালে ইন্সট্রাক্টর নিযুক্ত হন সামরিক একাডেমী, কোয়েটা। ১৯৬৯ সালে অফিসার, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, জয়দেবপুর ঢাকা। ১৯৭০ সালে ব্যাটালিয়ান কমান্ডার, অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট।

 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং একজন সেক্টর কমান্ডার হিসাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘‘বীরউত্তম‘‘ উপাধী লাভ করেন  এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব ষ্টাফের দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর প্রধান-উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন।

 

১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, দলের চেয়ারম্যান মনোনীত হন এবং বাংলাদেশে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন এবং এই সালেই যোগ দিয়েছিলেন কমনওয়েলথের শীর্ষ সম্মেলনে, জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে ও ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনে।

 

১৯৮০ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। ১৯৮১ সালে আল-কুদ্দুস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ইরাক ইরানের যুদ্ধাবসানে চেষ্টা চালিয়ে যান অতপর  ৩০মে  সেনাবাহিনীর কতিপয় দুষ্কৃতিকারীর হাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শাহাদতবরণ করেন। সেই দিন তাহার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় এশিয়ার সর্ব বৃহৎ জানাজাটি তাহার ভাগ্যেই জুটেছিল।

 

পাঠক, এই বর্ণাঢ্য সৈনিক ও রাজনৈতিকের ৭১ এর ভয়াল মার্চ মাসের ঘটনাবলীর কিছুটা অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিজের লেখা ‘‘একটি জাতির জন্ম‘‘ বই এর অংশ বিশেষ হুবহু তুলে ধরলাম।

 

১৯৭১ সাল ২৪ মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ঢাকা চলে গেলেন। সন্ধ্যায় পাকিস্তান বাহিনী শক্তি প্রয়োগে চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার পথ করে নিল। জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্র নামানোর জন্যেই ছিল তাদের এই অভিযান। পথে জনতার সাথে ঘটলো ওদের কয়েক দফা সংঘর্ষ। এতে আহত হলো বিপুল সংখ্যক বাঙালি। সশস্ত্র সংগ্রাম যে কোন মুহর্তে শুরু হতে পারে, এ আমরা ধরেই নিয়েছিলাম। মানসিক দিক দিয়ে আমরা ছিলাম প্রস্তুত। পরদিন আমরা পথের ব্যারিকেড অপসারনের কাজে ব্যস্ত ছিলাম।

 

তারপর এলো সেই কালো রাত। ২৫ও ২৬ মার্চের মধ্যবর্তী কালো রাত। রাত ১টায় আমার কমান্ডিং অফিসার আমাকে নির্দেশ দিলো নৌবাহিনীর ট্রাকে করে চট্টগাম বন্দরে গিয়ে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করতে। আমার সাথে নৌবাহিনীর (পাকিস্তানী) প্রহরী থাকবে তাও জানানো হলো। আমি ইচ্ছা করলে আমার সাথে তিন জন লোক যেতে পারি। তবে আমার সাথে আমারই ব্যাটালিয়নের একজন অফিসারও থাকবে। অবশ্য কমান্ডিং অফিসারের মতে, সে যাবে আমাকে গার্ড দিতে।

 

এ আদেশ পালন করা আমার পক্ষে ছিল অসম্ভব। আমি বন্দরে যাচ্ছি কিনা তা দেখার জন্য একজন লোক ছিল। আর বন্দরে শর্বরীর মতো প্রতীক্ষায় ছিল জেনারেল আনসারী। হয়তো বা আমাকে চিরদিনের মতোই স্বাগত জানাতে। আমরা বন্দরের পথে বেরুলাম। আগ্রাবাদে আমাদের থামতে হলো। পথে ছিল ব্যারিকেড। এই সময় সেখানে এলো মেজর খালিকুজ্জামান চৌধুরী। ক্যাপ্টেন অলি আহমদের কাছ থেকে বার্তা এসেছে। আমি রাস্তায় হাঁটছিলাম। খালেক আমাকে একটু দূরে নিয়ে এল। কানে কানে বললো, ‘ওরা ক্যান্টেনমেন্ট ও শহরে সামরিক তৎপরতা শুরু করেছে। বহু বাঙালিকে ওরা হত্যা করেছে।’

 

এটা ছিল একটা সিদ্ধান্তগ্রহণের গ্রহণের চূড়ান্ত সময়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি বললাম, ‘আমরা বিদ্রোহ করলাম। তুমি ষোলশহর বাজারে যাও। পাকিস্তানী অফিসারদের গ্রেফতার করো। অলি আহমদকে বলো ব্যাটালিয়ন তৈরি রাখতে, আমি আসছি।

 

আমি নৌবাহিনীর ট্রাকের কাছে ফিরে এলাম। পাকিস্তানী অফিসার, নৌবাহিনীর চীফ পেটি অফিসার ও ড্রাইভারকে জানালাম যে, আমাদের আর বন্দরে যাওয়ার দরকার নেই।

Zia Janaja copy

এতে তাদের মনে কোন প্রতিক্রিয়া হলো না দেশে, আমি পাঞ্জাবী ড্রাইভারকে ট্রাক ঘুরাতে বললাম। ভাগ্য ভাল সে আমার আদেশ মানলো। আমরা আবার ফিরে চললাম। ষোলশহর বাজারে পৌঁছেই আমি গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে একটা রাইফেল তুলে নিলাম। পাকিস্তানী অফিসারটির দিকে তাক করে তাকেই বললাম, ‘হাত তুলো। আমি তোমাকে গ্রেফতার করলাম’ । সে আমার কথা মানলো। নৌবাহিনীর লোকেরা এতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো। পর মুহুর্তেই আমি নৌবাহিনীর অফিসারের দিকে রাইফেল তাক করলাম। তারা ছিল আটজন। সবাই আমার নির্দেশ মানলো এবং অস্ত্র ফেলে দিল।

 

আমি কমান্ডিং অফিসারের জীপ নিয়ে তার আসার দিকে রওয়ানা দিলাম। তার বাসায় পৌঁছে হাত রাখলাম কলিং বেলে। কমান্ডিং অফিসার পাজামা পরেই বেরিয়ে এলো। খুলে দিল দরজা। ক্ষিপ্রগতিতে আমি ঘরে ঢুবে পড়লাম এবং গলা শুদ্ধ  তার কলার টেনে ধরলাম।

 

দ্রুতগতিতে আমার দরজা খলে কর্ণেলকে আমি বাইরে টেনে আনলাম। বললাম ‘বন্দরে পাঠিয়ে আমাকে মারতে চেয়েছিলে? এই আমি তোমাকে গ্রেফতার করলাম। এখন লক্ষ্মী সোনার মতো আমার সঙ্গে এসো’।

 

সে আমার কথা মানলো। আমি তাকে ব্যাটালিয়ানে নিয়ে এলাম। অফিসারদের মেসে যাওয়ার পথে আমি কর্ণেল শওকতকে ডাকলাম। জানালাম, ‘আমরা বিদ্রোহ করেছি। শওকত আমার হাতে হাত মিলালো।

 

ব্যাটালিয়নে ফিরে দেখলাম সমস্ত পাকিস্তানী অফিসারকে বন্দী করে একটা ঘরে রাখা হয়েছে। আমি অফিসে গেলাম। চেষ্টা করলাম লেফটেন্যান্ট এম আর চৌধুরীর সাথে আর মেজর রফিকের সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু পারলাম না। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারপর রিং করলাম বেসামরিক বিভাগের টেলিফোন অপারেটরকে। তাকে অনুরোধ জানালাম। ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপারিন্টেন্ট, কমিশনার, ডিআইডি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে যে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন বিদ্রোহ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করবে তারা।

 

এদের সবার সাথেই আমি টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাউকে পাইনি। তাই টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমেই আমি তাদের খবর দিতে চেয়েছিলাম। অপারেটর সানন্দে আমার অনুরোধ রক্ষা করতে রাজি হলো।

 

সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটালিয়নের অফিসার, জেসিও, আর জোয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানতো। আমি সংক্ষেপে সব বললাম এবং তাদের নর্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে হৃষ্টচিত্তে এ আদেশ মেনে নিলো। আমি তাদের একটা সামরিক পরিকল্পনা দিলাম।

 

তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্তের আখরে বাঙালিদের হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিন টিকে। স্মরণ রাখবে, ভালবাসবে। এই দিনটিকে তারা কোনদিনও ভুলবে না। কো-ন-দি-ন-না।

 

পাঠক, এখানে প্রতিয়মান ৭১এ মুক্তিযুদ্ধের মহাসঙ্কট সদ্ধিক্ষণে রাজনৈতিক নের্তৃত্ব যখন দিশেহারা। পরবর্তী করনীয় বা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কোন প্রকার দিক নির্দেশনা দিতে যখন ব্যর্থ হতে চলেছিল ঠিক তখনই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘোষনাই যথার্থভাবে জাতিকে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছিল। তাই তো বলি “জিয়া তোমায় ভূলবে না এ জাতি কো ন দি ন ও না!”।

 

তাহার সুকৌশল নেতৃত্বেই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যময় সময় অতিক্রম করেছে জাতি। ৭১ থেকে ৮১ পূর্ব ইতিহাস পর্যালোচনায় সহজেই দৃশ্যমান হয়, বিভিন্ন জাতীয় সঙ্কট সন্ধিকালে শহীদ জিয়ার নেতৃত্ব ও তাহার কর্তৃত্ব জাতিকে দিয়েছে সঠিক পথ নির্দেশনা।

 

অপর দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষকে সুসংগঠিত করেছিলেন এবং তাহার নেতৃত্বেই সাড়ে ৭ কোটি মানুষ স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলো। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের মুখে স্বাধীনতা ঘোষণার অধিক আগ্রহে ছিলো জাতি।

 

কিন্তু ইতিহাস বলে, দূর্ভাগ্যক্রমে সেই দিন স্বাধীনতা ঘোষনার সবকিছু প্রস্তুত থাকার পরও স্বাধীনতার ঘোষনা থেকে বিরত থাকেন শেখ মুজিবুর রহমান।

 

যার ফলশ্রুতিতে ৭ই মার্চ থেকে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত বাংলার মানুষ ছিল রাখাল বিহীন। ২৬শে মার্চ জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে সমগ্র জাতি বাংলার রাখালকে খুঁজে পায় এবং মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। জাতির জন্য যারা পর্বত ঘেরা পাহাড় কেটে কুসুমাস্থীর্ণ পথ বাহির করেছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিঃসন্দেহে তাদের শীর্ষ একজন।

 

পাঠক, এখানে শহীদ জিয়া পাকিস্তান থাকাকালীন সময়ে স্কুল জীবনের এবং ১৯৫৪ সালের যুক্ত ফ্রন্টের এই দুইটি ঘটনা না বললে আমার কথাগুলো অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই আবারও শহীদ জিয়ার লিখা ‘‘একটি জাতির জন্ম‘‘ থেকে আরও কিছু অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে হুবহু তুলে ধরলাম।

 

স্কুল জীবন থেকেই পাকিস্তানীদের দৃষ্টিভঙ্গির অসংগ্লনতা আমার মনকে পীড়া দিত। আমি জানতাম, অন্তর দিয়ে ওরা আমাদের ঘৃণা করে। স্কুল জীবনে বহুদিন শুনেছি আমার স্কুল বন্ধুদের আলোচনা। তাদের অভিবাবকরা বাড়ীতে যা বলতো, তাই তারা স্কুল প্রাঙ্গনে রোমন্থর করতো। আমি শুনতাম, মাঝে মাঝেই শুনতাম তাদের আলোচনার প্রধান বিষয় হতো বাংলাদেশকে শোষন করার বিষয়ক।

 

পাকিস্তানী তরুণ সমাজকেই শিখানো হতো বাঙালিদের ঘৃণা করতে। বাঙালিদের বিরুদ্ধে স্কুল ছাত্রদের শিশু মনেই ঘৃণার বীজ উপ্ত করে দেয়া হতো। স্কুলে শিক্ষা দেয়া হতো তাদের, বাঙালিকে নিকৃষ্টতম জাতি হিসেবে বিবেচনা করতে। অনেক সময় আমি থাকতাম নিরব শ্রেুাতা। আবার মাঝে মাঝে প্রত্যাঘাতও হানতাম নিজেও।

 

সেই স্কুল জীবন থেকেই মনে মনে আমার একটি আকাঙ্খা লালিত হতো, যদি কখনও দিন আসে, তাহলে এই পাকিস্তানীবাদের অস্তিত্বেই আমি আঘাত হানবো। সযন্তে এই ভাবনাটাকে আমি লালন করতাম। আমি বড় হলাম। সময়ের সাথে সাথে আমার সেই কিশোর মনের ভাবনাটাও পরিণত হলো, জোরদার হলো। পাকিস্তানী পশুদের বিরুদ্ধে অশ্র ধরার দুর্বারতম আকাঙ্খা দুর্বার হয়ে উঠতো মাঝে মধ্যে। উদগ্র আকাঙ্খা জাগত পাকিস্তানের ভিত্তি ভুমিটাকেও তছনছ করে দিতে। কিন্তু উপযুক্ত সময় আর স্থানের অপেক্ষায় দমন করতাম সেই অপেক্ষাকে।

 

১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো নির্বাচন, যুক্তফ্রন্টের বিজয় রথের চাকার পিষে পিষ্ট হলো মুসলিম লীগ। বাঙালিদের আশা আকাঙ্খার মুর্ত প্রতীক যুক্তফ্রন্টের বিজয় কেতন উড়লো বাংলায়। আমি তখন দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্যাডেট। আমাদের মনেও জাগলো তখন পুলকের শিহরণ। যুক্তফ্রন্টের বিরাট সাফল্যে আমরা সবাই পর্বতঘেরা এ্যাবোটাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আনন্দে উদ্বেলিত হলাম। আমরা বাঙালী ক্যাডেটরা আনন্দে হলাম আত্মহারা। খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করলাম সেই বাঁধভাঙ্গা আনন্দের তরঙ্গমালা। একাডেমী ক্যাফেটেরিয়ায় নির্বাচনী বিজয় উৎসব করলাম আমরা। এ ছিল আমাদের বাংলা ভাষার জয়। এ ছিল আমাদের অধিকারের জয়। এ ছিল আমাদের আশা আকাংখার জয়। এ ছিল আমাদের জনগণের, আমাদের দেশের এক বিরাট সাফল্য।

 

এই সময়ই একদিন কতিপয় পাকিস্তানী ক্যাডেট আমাদের জাতীয় নেতা ও জাতীয় বীরদের গালাগাল করলো। তাদের আখ্যায়িত করলো বিশ্বাসঘাতক বলে। আমরা প্রতিবাদ করলাম। অবতীর্ণ হলাম তাদের সাথে উষ্ণতম কথা কাটাকাটিতে। মুখের কথা কাটাকাটিতে এই বিরোধের মীমাংসা হলোনা। ঠিক হলো, এর ফয়সালা হবে, মুষ্টিযুদ্ধের দন্দ্বে। বাঙালিদের জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আমি বক্সিং গ্লাভস হাতে তুলে নিলাম। পাকিস্তানী গোয়ার্তূমীর মান বাচাতে এগিয়ে এলো এক পাকিস্তানী ক্যাডেট। তার নাম লতিফ (পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অর্ডিন্যান্স কোরে এখন (১৯৭২) সে লেফটেন্যান্ট কর্ণেল)। লতিফ প্রতিজ্ঞা করলো, আমাকে সে একটু শিক্ষা দেবে। পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে, যাতে আর কথা বলতে না পারি, সেই ব্যবস্থা নাকি সে করবে।

 

এই মুষ্টিযুদ্ধ দেখতে সেদিন জমা হয়েছিল অনেক দর্শক। তুমুল করতালির মাঝে শুরু হলো, বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের দুই প্রতিনিধির মধ্যে মুষ্টিযুদ্ধ। লতিফ আর তার পরিষদ দল অকথ্য ভাষায় আমাদের গালাগাল করলো। হুমকি দিলো বহুতর। কিন্তু মুষ্টিযুদ্ধ স্থায়ী হলো না ত্রিশ সেকেন্ডের বেশি। পাকিস্তানপন্থী আমার প্রতিপক্ষ ধুলোয় লুটিয়ে পড়লো। আবেদন জানালো, সব বিতর্কের শান্তিপূর্ণ মিমাংশার জন্যে। এই ঘটনাটি আমার মনে এক গভীর রেখাপাত করেছিল।

 

পাঠক এতে প্রমাণিত হয়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাল্যকাল থেকেই পাকিস্তানীদের কার্যকলাপে তিলে তিলে দগ্ধ হয়ে বড় হয়েছিলেন। খুবই নিকট থেকেই তাদেরকে চেনাজানার সৌভাগ্য হয়েছিল । তাই তখন থেকেই তাহার জন্মেছিল ঘৃণা ও আক্রোশ। সেই থেকেই পাকিস্তানবাদের অস্তিত্বে আঘাত হানার দৃঢ় সংকল্প করেছিলেন, সযত্নে রেখেছিলেন ভাবনাগুলো, আকাঙ্খা জাগছিলো পাকিস্তানবাদকে তছনছ করে দিতে, কিন্তু উপযুক্ত সময় ও স্থানের অপেক্ষা করছিলেন। বিধাতা তাহাকে-ই সেই সুযোগ করে দিয়েছিলেন, ১৯৭১ এ  ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে, পাকিস্তানীবাদের বিরুদ্ধে আঘাত হানার এবং একজন সাহসী সেক্টর কমান্ডার হিসাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে পাকিস্তানীবাদের অস্তিত্বকে তছনছ করে দিয়েছিলেন। তাহার সৈনিক জীবন ও স্বাধীনতার ঘোষণা স্বার্থক হয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের মাধ্যমে।

 

পাঠক শুধু এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৫ই আগষ্টের বেদনাদায়ক ঘটনাবলীর মাধ্যমে সামরিকতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সামরিকতন্ত্রের বদলে গণতন্ত্র চালু করেন। তিনি ব্যক্তিগত মন ও মানসে ছিলেন গণতান্ত্রিক।

 

যার ফলে ৭৯ সালে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, সাধারণ নির্বাচন দিয়ে, বাকশাল কর্তৃক গলা টিপে হত্যা করা গণতন্ত্রকে, বহুদলীয় গণতন্ত্রে পূণঃজীবিত করেছিলেন। তখন তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং সরকার গঠণ করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অল্প দিনে পৌছেছিলেন জনপ্রিয়তার উচ্চশিখরে।

 

এদিকে বাকশাল আমলে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বদরবারে বটমলেস বাস্কেট (তলাবিহীন ঝুড়ী) হিসাবে পরিচিত। কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সামান্যদিনের রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশকে খাদ্যে স্বয়সম্পূর্ণ করে বিদেশেও খাদ্য রপ্তানী করা শুরু করেছিলেন। বাংলার খালে-বিলে সৃষ্টি করেছিলেন স্রোত, কলকারখানা চালু হয়েছিল, কৃষিতে মানুষ মনোনিবেশ করেছিল, জনশক্তি রপ্তানী তাহার আমলেই শুরু হয়েছিল এবং আজকের সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক ছিলেন তিনিই।

 

তাহার মাত্র ৪/৫ বৎসর রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশকে করেছিলেন উন্নয়নমূখী। বাংলাদেশ আর বটমলেস বাস্কেট থাকে নাই। বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন।

 

পাঠক, ইতিহাস বলে, ‘একজন  সামরিক শাসক যখন পদত্যাগ করে অথবা মৃত্যুবরণ করে তখন সেই ব্যক্তি বা দলের কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা, সবই নিঃশেষ হয়ে যায় কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিরায়ত ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে, তিনি তাঁর মৃত্যুর পরে হয়ে উঠেছেন আরও অপ্রতিরোধ্য। সত্যি সত্যি এক জিয়া লুকান্তরিত হওয়ার পর বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে লক্ষ লক্ষ জিয়ার জন্ম হয়েছে। জিয়াউর রহমান সুচিত এবং প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি রাজনৈতিক আদর্শ, কর্মসূচী এবং প্রতিষ্ঠান হয়েছে আরও বেগবান আরও গতিশীল। আজ তাহার প্রতিষ্ঠিত প্রাণপ্রিয় সংগঠন বিএনপি হয়ে উঠেছে জনগণের আশীর্বাদ ও সমর্থনধন্য বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সংগঠন।  তাই বলি, আত্মজাগতির ইতিহাসে জিয়া তুমি অনন্য। তোমার নাম কেহই কোনদিন মুছে দিতে পারবেনা এ জাতির অন্তর আত্মা থেকে, এ জাতির ইতিহাস থেকে। জাতি কোনদিন তোমায় ভূলবে না, ‘‘কো ন দি ন ও না!’’।

 

লেখক

সায়েক এম রহমান

লেখক ও কলামিস্ট

sayakurrahman@hotmail.com

 

 

 

.

 

.

**এখানে প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব, প্রথম নিউজের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভুক্ত নয়।**

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ