সোমবার, ২১ আগষ্ট, ২০১৭

গুমপুর থেকে ফিরে একজন গুমপুরীর বক্তব্য

জুলাই ১৭, ২০১৭ 980 views 0
গুমপুর থেকে ফিরে একজন গুমপুরীর বক্তব্য

সায়েক এম রহমান :

গুম খুনের দেশ বাংলাদেশ। গুমের আতংকে সারা দেশ। গুম খুন হলো, বর্তমান বাংলাদেশের নৈমনৈতিক ব্যাপার। ২০১২/১৩ সাল থেকে দেখে আসছি, গুম হলে,  ভ্যাগ্যিস যারা, তারা কেউ কেউ ফিরে এসে ভর্তি হন হাসপাতালে, কেউ কেউ ফিরেন লাশ হয়ে খালে আর বিলে, না হয় কোন বাড়ীর অদূরে, আর বেশীর ভাগ কে পাওয়াই যায় না।

 

লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো, যারা গুমপুর থেকে এক সপ্তাহ বা এক মাস বা ছয় মাস পর ফিরে আসেন বা পাওয়া যায়, তারা কিন্তু কোন মিডিয়া বা অন্য কোথাও মুখ খুলতে দেখা যায় না। যদিও দেশ ও জাতি অধীর আগ্রহে থাকেন, তাদের মুখ থেকে  কিছু জানার জন্য, শুনার জন্য। অতিরিক্ত জোর করলে তারা বলেন, কিছুই মনে নাই।

 

কিন্তু এখানে ১৮ ঘন্টা পর গুমপুর থেকে ফিরে আসা অকুতোভয়  লেখক,কবি কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক জনাব ফরহাদ মজহারই এই প্রথম মিডিয়ার সামনে মুখ খুললেন। শুধু মুখই খুললেন না, এই অকুতো্ভয় কবি ও প্রাবন্ধিক আরো বললেন,” গুমের রহস্য প্রকাশে আমি ভীত নই। আমাকে   সুস্হ হতে দিন। আমি গুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাব। অপহরন সংস্কৃতির সমাপ্তি ঘটাতে হবে।

 

পাঠক, ১২ জুলাই বুধবার,,,,বারডেম হসপিটেলের বেড থেকে, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক গনমাধ্যম দৈনিক গার্ডিয়ানের কাছে প্রথম মুখ খুললেন কবি,প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার জনাব ফরহাদ মজহার।

 

তাহার এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সেদিন কার নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমি মানসিক আঘাত প্রাপ্ত। স্বাভাবিক হতে হয়তো আরো অনেক সময় লাগবে। অনেক খোলামেলা ভাবেই বললেন, গুম হওয়ার পর যারা জীবিত ফিরে আসেন তারা কিন্তু রহস্য জনক ভাবে নিরবতা অবলন্বন করেন। তবে আমার সন্গে যাহা হয়েছে আমি প্রকাশ করতে মোটেই ভীত নই। যখন আমি সুস্ত হবো, কাজে ফিরবো, তখন এই ইস্যুতে আমি কজ করব। জোর গলা দিয়া বললেন,এমন গুমের সংস্কৃতি আমাদেরকে বন্ধ করতেই হবে। সাক্ষাতকারটি নিচ্ছিলেন, গার্ডিয়ানের দক্ষিন এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি মাইকেল সাফি।

 

৩ রা জুলাই সোমবারের ঘটনা বলতে গিয়ে তাঁহার ভাষায় বললেন,” সেদিন সকালে আমার চোঁখে সমস্যা হচ্ছিল। তাই খুব ভোরে ওষধ কিনতে বের হয়েছিলাম। তখন হঠাৎ সাদা পোষাকে তিনজন ব্যক্তি আমার পাশে এসে আমাকে ধাক্কাধাক্কি করে একটা সাদা মিনিবাসে তুলে নেয়। ধাক্কাধাক্কি করত অবস্হায় আমার মোবাইল দ্বারা স্ত্রীকে ফোন দেই। এটা ছিল স্বল্প সময়ের ফোন কল।আমি শুধু বলতে পেরেছি, “ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে”।

 

অতঃপর কর্কশ ভাষা ব্যবহার করে আমাকে থাপ্পড় মারল, ফোন কেঁড়ে নিল, চোঁখ বেঁধে দিল এবং তাদের হাঁটু ব্যবহার করে, গাড়ীর মেঁঝেতে চেঁপে ধরল। এক পর্যায়ে মুক্তি পন দাবী করে, কয়েক বার আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলায়। এ ছাড়া চোঁখ বাঁধা অবস্হায় চলন্ত গাড়ীতে আমাকে অশ্লীন কথা বলে এবং এতো বাড়াবাড়ি করিস কেন বলে চড় থাপ্পড় মারে। এই ভাবে ১০/১২ ঘন্টা অতিবাহিত হওয়ার পর হঠাৎ আমাকে মুক্ত করে দিবে বলে খুলনার একটি নির্জন ও অন্ধকার স্হানে আমার হাত চোঁখ খুলে দিয়ে বাসের একটি ঠিকেট আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঢাকা চলে যাওয়ার কথা বলে।

 

অতপর ভয় আতংকে হেঁটে খুলনা শহরের একটি শপিং মলের এলাকায় আসি।রাত সোয়া নয় টার বাসে উঠার আগে কিছু খাবার খাই।

 

তিনি কিন্তু একটি কথা গার্ডিয়ান কে বারবারই বলেন, আমি বন্দী অবস্হায় আমার স্ত্রীরসাথে ৪/৫ বার কথা বলায় কিন্তু তারপরও কেন যে পুলিশের এতো উন্নত ব্যবস্হা থাকার পর খুলনা যাওয়ার আগে আমাকে সনাক্ত বা উদ্বার করতে পারল না।

 

অপর দিকে, কবি, লেখক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহারের নাটকটি যারাই তৈয়ার করেছেন তারা কিন্তু জাতিকে কনফিউজড করে, হাসির খোরাক যোগিয়েছেন।

 

১। জনাব মজহার সাহেবের বক্তব্যের সাথে তাদের অমিল সীমাহীন।
২। তারা প্রথমে বললেন স্ত্রীর সাথে কথা কাটাকাটি বা প্রবলেম হওয়াতে অভিমান করে মজহার সাহেব আত্নগোপনে চলে গেছেন।
তাঁকে কেউ অপহরন করেনি। তারপরও আমরা তদন্ত করে দেখছি।
৩। পরের দিন আবার স্বরাষ্টমন্ত্রী বললেন, কেউ যদি তাঁকে সীমান্ত পার করে দিতেন তবে পরিস্হিতি ভয়াবহ হতো। এটাই ভাবিয়ে তুলেছে।
৪। তারপর দায়িত্ব প্রাপ্ত পুলিশ অফিসার বললেন, আগের বক্তব্য সবই বাদ এখন থেকে যা বলা হবে সেটাই আসল বা সত্য। এ সময় বলা হলো, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য মজহারকে অপহরন করা হয়েছে।
৫। আদালতে মজহার সাহেবকে দেশবাসী দেখল, অসুস্হ, অচেতন ও ক্লান্ত। কিন্তু খুলনার ডিআইজি সাহেব আবার বললেন, তিনি নিজ  ইচ্ছায় ঢাকা থেকে খুলনায় এসে বেড়াচ্ছেন এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই আছেন।
৬। এখন আবার বলা হচ্ছে, পরকিয়ায় ব্যস্ত মজহার সাহেব। তাহার প্রেমিকা অর্চনার ফোন পেয়ে ৭০ বৎসর বয়স্ক জনাব মজহার বাসা থেকে বের হোন।

কোনটি ঠিক? মানুষ আসলে ধুম্রজালে পড়ে কৌতুক নাটক উপভোগ করছে।

 

এদিকে মজার ব্যাপার হলো ‘যমুনা নিউজের’ একটি ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা গেল ‘ঘটনার দিন বিকালে জনাব মজহার সাহেব খুলনার নিউ মার্কেট এলাকায় সাদা একটা ব্যাগ নিয়ে হাঁটতেছেন। কিন্তু কবি ফরহাদ মজহার তাঁহার জবান বন্দীতে বললেন, সন্ধায় নির্জন অন্ধকারছন্ন স্হানে চোঁখ খুলে দিয়ে ঢাকা যাওয়ার একটা টিকেট হাতে ধরিয়ে তারা চলে যায়। অতঃপর কিছুদূর হেটেঁ নিউ মার্কেট এলাকায় চলে আসেন’।

 

তাহলে এখানে কী প্রমানিত হলো? তাহলে কি এখানে প্রমানিত হলো না “সরকার ও পুলিশের যোগসাযোসে তারা সর্ব্বোচ ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য”?

 

আর কত ধামাচাপা? আর কত নাটক? আর কত স্ক্রীপ্ট? দেশের মানুষদের কে এতো বোকা ভাবা মোটেই ঠিক নয়। বিশেষ করে দেশের শীর্ষস্হান সমূহ থেকে।

 

স্বরাষ্টমন্ত্রীর ভাষায় “যদি তাঁকে কেউ সীমান্ত পার করে দিতেন বা তিনি পার হয়ে যেতেন তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতো। তা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে”।

 

স্বরাষ্টমন্ত্রীর এই কথাটির মাধ্যমে কি স্বাধীন একটি দেশের নিরাপত্তার চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে দিলেন না? আজ দেশের প্রতিটি মানুষই নিরাপত্তাহীন। নিজ দেশের একজন ফাস্টক্লাস সিটিজেনকে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া মানে নিজ দেশের নিয়ন্ত্রন নিজ হাতে নেই। এটাই প্রমানিত।

এটাই আজ বাস্তব বাংলাদেশ।

 

Sayak-M-Rahman লেখক

 সায়েক এম রহমান

লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক

sayakurrahman@hotmail.com

 

.

.

 

***এখানে প্রকাশিত সকল মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব, প্রথম নিউজের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভুক্ত নয়।***

 

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • সবচেয়ে পঠিত

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ