বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

কে সরে দাড়াবেন? হাসিনা না-কি সিনহা ?

আগস্ট ২৩, ২০১৭ 5961 views 0
কে সরে দাড়াবেন? হাসিনা না-কি সিনহা ?

এম মাহাবুবুর রহমান :

তিনটি বর্ণের দু‘জন মানুষের ক্ষমতার মধ্যে আটকে গেছে বাংলাদেশ। ‘হ’, ‘স’ আর ‘ন’। এদের একজন হা-সি-না, প্রধানমন্ত্রীর (অবৈধ) দায়িত্বে। আরেকজন সি-ন-হা, প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে (অবৈধ সরকারের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত)। যিনি হাসিনা, তিনি-ই সিনহা। দু’জনের নামও প্রায় এক। হা-সি-না‘র নামে কেবল একটি আ-কার (া) বেশী। দু‘জনই একই সূত্রের মানুষ। তাদের শক্তির কেন্দ্র একই জায়গায়। হয়তো হিসাবে কিছুটা গড়মিল দেখা দিয়েছে বলেই এখন বিতর্ক চলছে। কেন্দ্র যখন যে প্রেসক্রিপশন দিয়েছে, তখন-ই তারা তাদের গুটির চাল দিয়ে এসেছেন; ভবিষ্যতেও দেবেন। এখন বিভ্রান্তিটা হলো- পরিকল্পিতভাবে গুটির চালটা হয়তো দিতে পারেনি কোনো পক্ষ। অথবা স্ক্রিপ্টে নতুন কোনো পর্বেরও সংযুক্তি হতে পারে।

 

সত্যিকার অর্থেই হাসিনা ও সিনহা, দু’জনকেই আমি গণবিরোধী মানুষ হিসেবে দেখি। তাদের দু’জনের হাতেই রক্ত। গণতন্ত্র হত্যা, বিরোধী রাজনীতিক হত্যা, আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে অনেক দেশপ্রেমিক মানুষকে হত্যায় তারা এক টেবিলে বসেই পরিকল্পনা করেছেন। আদালত-ন্যায়বিচার এমনকি মানুষ হিসেবে সাধারণ ন্যায়বোধও তাদের কাজ করেনি।

 

কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়া যেদিন দেশপ্রেমিক সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে হত্যা করা হয়, সেদিন থেকেই আমি বিচারপতি নামের এসব রক্তখেকোকে চূড়ান্তভাবে ঘৃনা শুরু করি।

 

বাংলাদেশের হাইকোর্ট থেকে বিভিন্ন জেলা জজ আদালতে বিচারকদের দলীয় আচরণ স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সাথে জেলায় জেলায় ছুটে গিয়েছি মামলার হাজিরায়। বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়েছে আদালতপাড়ার।

 

বিচারক হিসেবে চাকুরিতে আছেন, এমন অনেক সহপাঠীর সঙ্গে তাদের দলবাজির বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কেবল চাকুরি রক্ষা ও পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার অজুহাতই মিলেছে!!

 

তবে গত এক বছরের বেশী সময়ে বৃটিশ কোর্টে কাজ করার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের বর্তমান আদালতকে আমার কখনো ‘বিচারালয়’ মনে হয় না।

 

যাই হোক, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আদালতের রায়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যারা উচ্ছলিত, আমি তাদের দলে নই। এমনকি এমন কোনো রায় নিয়ে আমি খুব বেশী আশাবাদীও নই।

 

কেননা এ পরিস্থিতিকে আমি অন্য ইভেন্টের মতোই বিবেচনা করি। কারন, ২০১২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারত সফরের অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক কিছু-ই শিখিয়েছে। স্পষ্টতই, আমি ঘটনাকে খালি চোখে না দেখে একটু অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করি।

 

২০১৩ সালের ‘শাহবাগে গণজাগরণ’ নামের যে দৈত্যের মেলা বসেছিল, তিন মাস আগেই আমি এর পূর্ভাবাস দিয়েছিলাম। কেননা এমন একটি মঞ্চ করার অফার আমরা পেয়েছিলাম। আমারদেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিএনপি বিটের সহকর্মী সাংবাদিক কাফি কামাল, আফজাল বারী, মঈন উদ্দীন খান এবং টেলিভিশনের কয়েকজন সহকর্মী সেই দৌড়ঝাপ সম্পর্কে ডিসেম্বরেই কিছুটা অবহিত ছিলেন। এ বিষয়ে অন্য একদিন লিখবো।

 

বস্তুত, বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র এখন একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ঢাকায় যারা ক্ষমতা ধারণ করেন; তারা হয় দালাল, নয়তো মানসিক রোগীতে পরিণত হয়েছেন। নিজের ভালো লাগার অনুভূতি, দেশপ্রেম, সন্তানের ভবিষ্যত, এমনকি নিজের প্রিয় শরীরটাকেও কলুষমুক্ত রাখার মানুষের বড্ড অভাব দেখা দিয়েছে। অন্ধ স্বার্থের পেছনে ছুটছেন সবাই। ক্ষণস্থায়ী এসব মূল্যহীন স্বার্থ আমাদের করে তুলেছে বিবেক-বিবের্জিত। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ এবং নানাবিধ চেতনার শ্লোগান নতুন প্রজন্মকে বিষিয়ে তুলেছে। এসব মূল্যহীন বচসা কোনোভাবেই নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।

 

সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিচারপতি, সচিবদের মুখে ‘মহামানব’ বিশেষণে কেবল ঘৃণিতই হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। ‘হায় মুজিব, হায় মুজিব’, ‘জাতির পিতা’, জন্মদিনে শিক্ষার্থীদের দিয়ে মুজিবের মূর্তি প্রণাম করতে বাধ্য করার ঘটনা শেখ মুজিবের আত্মার শাস্তি বাড়ানো ছাড়া কোনো কাজে আসে বলে আমার মনে হয় না।

 

সত্যিকার অর্থেই আমি যখন শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এমন একজন ত্যাগী মানুষকে নিয়ে ভাবি, তখন তাঁর দুর্ভাগ্য আমায় ব্যথিত করে। লোকটির কোনো প্রজন্মই তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করবে না!!

 

তাঁর মেয়েরা জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে, আর নাতি-নাতনিরা সুখী হয়েও অমুসলিম বিয়ে করে ইসলাম ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আফসোস!!

 

একটি বিষয় খেয়াল করা জরুরী, আওয়ামী লীগ নামক দলটির ক্ষমতায় থাকার প্রধান মার্কেটিং পন্য ছিল ‘যুদ্ধাপরাধী’ ইস্যু। সেই ইস্যু শেষ হয়ে গেল ২০১৬ সালে। এরপরই শুরু হলো জঙ্গী ইস্যু। জঙ্গী ইস্যুতে বাংলাদেশের ইনভেস্ট অনেক বড়ই চলা চলে।

 

কিন্তু কিছু সত্যি ঘটনার পাশাপাশি একাধিক নাটকের কারনে মানুষের কাছে এই ইস্যুটি একেবারেই পানসে হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে আমি পজেটিভলি বিবেচনা করি।

 

হরতাল-ধর্মঘটসহ বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়াই গত দুই বছর পার করেছে দলটি। তবে একেবারে চুপসে য্ওায়াটা সঠিক হয়নি।

 

সারাদেশে রোডমার্চ, লংমার্চের মতো গণকর্মসূচি এখন খুবই জরুরী।
যাই হোক, ক্ষমতা টেকানোর কৌশলে আওয়ামী লীগ এখন একেবারেই ইস্যুবিহীন। উন্নয়নের মিথ্যা শ্লোগান জনগণের কাছে প্রমাণিত!!!

 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাজারজাত আর কত??? দুর্নীতি, লুট আর বিনা ভোটের সরকারে টিকে থাকার পাশাপাশি আরেকবার ক্ষমতায় আসার নতুন প্রকল্পই হলো আজকের ষোড়শ সংশোধনী বিতর্ক।

 

এই প্রকল্পের ওপর ভর করেই আওয়ামী লীগ চেষ্টা করবে আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন করতে!! এটা নিতান্তই আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার আলোকে পর্যবেক্ষণ।

 

কারন ষোড়শ সংশোধনী রায় বিতর্ক শুরু হতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বলেছেন, ‘জোর করে কাউকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর দরকার নাই’।

 

নির্বাচন কমিশনও সরকারের দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরী করছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ঘোষণা দিয়েই একথা বলেছেন। তবে ষোড়শ সংশোধনী রায় নিয়ে শেখ হাসিনার গতকালের (সোমবার) বক্তব্য অনেকটা হাস্যকরই মনে হয়েছে। অবশ্য তিনি এমনই।

 

আদালতের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল করিয়ে ‘রং হেডেড‘ উপাধীর পরও প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন। এবারতো প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগদাতার বিরুদ্ধে কিভাবে কথা বলেন? এমন প্রশ্ন রেখে সরে দাড়ানোর জন্য পরোক্ষ আহ্বানই জানিয়েছেন।

 

শেখ হাসিনা সোমবার আরও বলেন, ‘‘রায়টা আরো ভালোভাবে পড়া দরকার এবং এর প্রতিটি জায়গায় অনেক কথা বলার অবকাশ আছে। জাতির সামনে এগুলো তুলে ধরতে হবে। এরকম একেকটা কথা লিখে মানুষকে বিভ্রান্ত করে এতে তো ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। আমরা জনগণের কথা বলি। আমাদের জবাবদিহিতা আছে। জবাবদিহিতা আমাদের ওই ভোটারদের কাছে। জনগণের কাছে। ৫ বছর আমাদের সময়। এই ৫ বছর পরই আমাদের জনগণের আদালতে দাঁড়াতে হয়। সেখান থেকে আমরা যদি জনগণের কাজ করি তাহলে জনগণ আবার ভোট দেবে। আর যদি কাজ না করি তাহলে জনগণ ভোট দেবে না।’’ (সূত্র: দৈনিক মানবজমিন, ২২/০৮/২০১৭)

 

বিষয়টি হাস্যকর মনে হলেও শেয়ার করছি। দু‘জন মানুষের কথায় আমি সবচেয়ে বেশী হাসি। একজন নাটকের মোশাররফ করিম। আরেকজন রাজনীতির শেখ হাসিনা।

 

শেখ হাসিনা যখন ‘জনগণ’, ‘ভোট’, ‘জবাবদিহিতা’ এসব কথা বলেন, তখন জোরে জোরে হাসতে ইচ্ছে হয়। আমার স্কুল পড়ূয়া মেয়ে ঘুমায় বলে রাতে বাসায় জোরে হাসতে পারি না। আর অফিসে ইংলিশ কলিগদের পাশে বসে শব্দ করে হাসার সুযোগই পাই না।

 

তবে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে রায়ে অনেক সত্য কথা বললেও প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নিজেই একজন বিতর্কিত মানুষ। শুরুতেই বলেছি তাঁর হাতে রক্ত। তিনি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের রায়ের অন্যতম বিচারপতি ছিলেন। তিনি এখন নাটকের মূল চরিত্রে আছেন। পাকিস্তানের সুপ্রীমকোর্টের রায়ের সঙ্গে তুলনা করে তিনি নিজের ধৈর্যশীলতার উল্লেখ করেছেন।

 

এর মানে এই নয় যে, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ উম্মুক্ত করতে তিনি চূড়ান্তভাবে ভূমিকা রাখবেন। অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তিনি সরে যেতে বাধ্য করবেন, এমনটি আশা করাটা বোকামী। স্ক্রিপ্টের বাইরে গিয়ে বেশী কিছু তিনি বলবেন না, এটা আমি নিশ্চিত। মানুষ হিসেবে স্ক্রিপ্ট অনুসরনে তিনি/তারা যে ভুল করবেন, সেই ভুলের মধ্য থেকেই দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের একটি মুক্তির পথ বের করতে হবে।

 

আরও সাড়ে পাঁচ মাস সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি থাকবেন। শেখ হাসিনা তাকে যতই সরে য্ওায়ার আহ্বান জানান, কিংবা সরানোর চেষ্টা করুক; প্রকৃতপক্ষে চূড়ান্তভাবে স্ক্রিপ্টে তাঁর অপসারণের বা সরে যাওয়ার পর্বটি হয়তো-বা নেই। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাকে নিয়ে অনেক খেলাধূলা হবে। সেখানে মুক্তিকামী মানুষের কঠোর ভূমিকা না থাকলে হয়তো জাতির কাঁধ থেকে অবৈধ-দানবকে নামানোর সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তাই ভেতরে-বাইরে সমানভাবে কাজ করা জরুরী।

 

 


Mahabub

লেখক :

এম মাহাবুবুর রহমান

রয়টার্সের লন্ডন অফিসে কর্মরত;
*ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, দ্যা গার্ডিয়ান;
*সাবেক সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।

 

.

.

 

***এখানে প্রকাশিত সকল মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব, প্রথম নিউজের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভুক্ত নয়।***

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ