শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

নির্যাতিত মানুষ আশ্রয় চাইলে, আশ্রয় দিতে হয়

অক্টোবর ২, ২০১৭ 376 views 0
নির্যাতিত মানুষ আশ্রয় চাইলে, আশ্রয় দিতে হয়

তসলিমা নাসরিন :

নির্যাতিত মানুষ আশ্রয় চাইছে। তাদের আশ্রয় দাও। জানি তারা মানুষ ভালো নয়, তারা দেশের সর্বনাশ করবে। তারা ইয়াবা বিলিয়ে মানুষের মাদকাসক্তি বাড়াবে। তারা অস্ত্র হাতে নেবে, জিহাদি আন্দোলন করবে। বৌদ্ধদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবে।

 

মানুষ খুন করবে। একটা অশিক্ষিত অচেতন জনগোষ্ঠী দিয়ে আমাদের কোনও উপকার হবে না। কিন্তু যারা আশ্রয় ভিক্ষে চায়, তাদের আশ্রয় দিতে হয়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই অধিকার আছে যেখানে খুশি যাওয়ার, যেখানে ইচ্ছে বাস করার।

 

বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ। এত লক্ষ মানুষকে জায়গা দেওয়ার, ভাত কাপড় দেওয়ার, মাথার ওপর ছাদ দেওয়ার সামর্থ্য এ দেশের নেই। তারপরও নিকটতম প্রতিবেশী হওয়ার কারণে নির্যাতিত মানুষের ঢল বারবার এ দেশের কোলেই আছড়ে পড়বে। এই দেশ ইচ্ছে করলেই মিয়ানমার সরকারের মতো নিষ্ঠুর হতে পারে, শরণার্থীদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতে পারে, অথবা এদের ঠেঙ্গিয়ে বিদেয় করে দিতে পারে। কিন্তু মিয়ানমারের মতো অসভ্য দেশকে কেন বাংলাদেশ অনুসরণ করবে!

 

অনুসরণ করবে সভ্য দেশকে। অনুসরণ করবে জার্মানিকে, সুইডেনকে। সভ্য দেশগুলোয় লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ঢুকছে। শরণার্থীরা খুন ধর্ষণ কী না করছে, তারপরও তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেয়নি দেশগুলো। বরং মানবতার কথাই উচ্চারণ করেছে বারবার। বরং অন্ন বস্ত্র বাসস্থান জোগাড় করে দিয়েছে সবাইকে। বিনামূল্যে শিক্ষা স্বাস্থ্য দিয়েছে।

 

জলের তলায় গোটা বাংলাদেশ যেদিন ডুবে যাবে, সেদিন রোহিঙ্গাদের মতো এভাবে বিভিন্ন দেশের কিনারে বাংলাদেশিরা নৌকো ভেড়াবে, আশ্রয় ভিক্ষে চাইবে। তখন আশ্রয় না পেলে কোনও নো ম্যান্স ল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের মতোই তারা অসহায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আমরা যে কেউ যে কোনও দুর্ঘটনায় রোহিঙ্গাদের মতো উদবাস্তু হয়ে যেতে পারি। পারি না?

 

দুঃখ হয়, মুসলিম দেশগুলো উদার তো নয়ই, মানবাধিকার সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণাও নেই। মানবতা, সহমর্মিতা এসব তাদের অভিধানে নেই। অধিকাংশ মুসলিম দেশ নির্যাতিত মুসলিমদের আশ্রয় দেয় না। দেয় অমুসলিম দেশ। মুসলিম দেশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে সভ্য দেশের কাতারে দাঁড়াবার সুযোগটা নিক বাংলাদেশ!

 

মুসলমানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে মহান দেশ সৌদি আরব। ওই মাটিতে জন্মেছিলেন ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ওই মাটিতেই ইসলাম ধর্মের গোড়াপত্তন হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে যে মুসলিম মেয়েরা গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়েছে ওখানে, তাদের কেউ কেউ মুসলিম গৃহকর্তা দ্বারা নির্যাতিতা আর সম্ভ্রম হারিয়ে ফিরেছে। মেয়েরা এখন ভয়ে আর সৌদি আরবে যেতে চাইছে না। অন্যায় করলে কেউ ক্ষমা পায় না। সেদেশে দিনদুপুরে জন সমক্ষে তরবারি চালিয়ে অপরাধীর মুণ্ডু কেটে ফেলা হয়।

 

মুসলমানের মুণ্ডু যে কেটেছে মুসলমানেরা! মুসলমানরা মুসলমানদের ঘৃণা করে সবচেয়ে বেশি। মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশি গলা কাটে মুসলমানের। প্রায় প্রতিটি ধর্মগোষ্ঠী অতীতে বর্বর ছিল। ধীরে ধীরে বর্বরতা বিসর্জন দিয়ে সভ্য হয়েছে, অথবা সভ্য হচ্ছে। মুসলমানদেরও তাই করতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই। মুসলমান সন্ত্রাসীরা যেভাবে সন্ত্রাস করছে গোটা বিশ্ব জুড়ে, আজ মুসলমানের নাম শুনলে মানুষ সিঁটিয়ে থাকে ভয়ে, অথবা রেগে আগুন হয়ে ওঠে, অথবা ঘৃণায় নাক কুঁচকোয়। সে কারণেই বলছি উদার হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই আমাদের।

 

আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মানুষ করার দায় বাংলাদেশ সরকারকে নিতে হবে। ইসলামি দলগুলো চাইবে ওদের জঙ্গি বানাতে। চোরাকারবারিরা চাইবে ওদের চোরাকারবারে ঢোকাতে। মাদক ব্যবসায়ীরা চাইবে ওদের মাদক ব্যবসায় নামাতে। শিশু পাচারকারীরা চাইবে ওদের দিয়ে শিশু পাচার করতে।

 

কিন্তু সরকারকে চাইতে হবে ওরা মানুষ হোক। সরকার মন দিয়ে চাইলে সেটি না হয়ে যাবে কোথায়? সরকার নিশ্চয়ই জানে অসভ্য আর অশিক্ষিতকে সভ্য আর শিক্ষিত করতে হলে কী পদক্ষেপ নিতে হয়।

 

মিয়ানমার থেকে রাষ্ট্রের নির্যাতন সইতে না পেরে রোহিঙ্গা-মুসলিমরা দেশান্তরী হচ্ছে। কোনও না কোনও দেশকে তো তাদের জায়গা দিতে হবে। এরা তো মানুষ-প্রজাতি।

 

আজ হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ আর মিয়ানমারের সীমান্তের মাঝখানে ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’-এ বসে বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষা করছে। কোনও সীমান্ত প্রহরীই এদের কোনও দেশে পা রাখতে দিচ্ছে না। তারা আজ আপাদমস্তক ব্রাত্য।

 

আসলে মিয়ানমারের উচিত এদের ফিরিয়ে নেওয়া, নাগরিকত্ব দেওয়া, এদের শিক্ষা স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, উচিত এদের মানবাধিকার লংঘন না করা। কিন্তু তা যদি না করে মিয়ানমার, তবে জাতিসংঘ চাপ দিক, দাতা দেশগুলো চাপ দিক, বন্ধু দেশগুলো বলুক। তাতেও যদি কাজ না হয় তাহলে মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলুক সবাই। আর কেউ না নিক, রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব অন্তত প্রতিবেশী দেশগুলোকে আপাতত নিতে হবেই।

 

রোহিঙ্গারা আরাকানের আদিবাসী, অথবা পূর্ব বাংলা থেকে ব্রিটিশ আমলে বার্মায় গিয়েছে—ইতিহাস খুঁড়ে দেখার দরকার নেই এখন। মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে, মানুষের পায়ের তলায় মাটি নেই—এটিই এখন সত্য।

 

এই অপ্রিয় সত্যটি আমাদের সামনে ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর গায়ে একখানা কাপড় তো আমাদের পরাতেই হবে। অতিথিকে বিরাট কিছু না মানতে পারি, মানুষ বলে তো মানতে পারি।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • সবচেয়ে পঠিত

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ