শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া : কেন ও কিভাবে?

অক্টোবর ৬, ২০১৭ 149 views 0
৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া : কেন ও কিভাবে?

মো: মতিউর রহমান :

২-এর সংবিধান সম্পর্কে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি আবেগ ক্রিয়াশীল বলে মনে হয়। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দেন এবং ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলেন। তারা তাদের বিভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যেই তা করছেন।

 

এ ক্ষেত্রে তারা মস্তিষ্কের চেয়ে হৃদয় দ্বারা, অর্থাৎ যুক্তির চেয়ে আবেগ দ্বারাই বেশি তাড়িত হচ্ছেন এবং এ ক্ষেত্রে তারা মোহাচ্ছন্ন বলে মনে হয়। তারা ’৭২-এর সংবিধানকে এতটাই পবিত্র মনে করেন যে, এটা অলঙ্ঘনীয়।

 

এটা বেমালুম ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, এটা কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়। তাই এটার কোনো পরিবর্তন বা সংশোধন করা যাবে না বলে মনে করা যায় না। তার চেয়ে বড় কথা, বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সংবিধান তিনি নিজেই চারবার সংশোধন করে গেছেন।

 

এরপরও ১২ বার (মোট ১৬) আমাদের সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারও দু’বার সংবিধান সংশোধন করেছে (পঞ্চদশ ও ষোড়শ)। অবশ্য ইতোমধ্যে উচ্চ আদালত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছেন।

 

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার নিজেই ’৭২-এর সংবিধানের বহু বিধান বাতিল বা সংশোধন করে সামরিক ফরমান বলে প্রতিষ্ঠিত বিধানকে (যেমন- রাষ্ট্রধর্ম, নাগরিক পরিচয়, নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ) পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে স্থান দিয়েছে। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অর্থ কী এবং অবকাশ কোথায়?

 

বাস্তবে মানবরচিত কোনো কিছুই ভুলভ্রান্তির এবং পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে নয়। সংবিধান মানবরচিত দলিল, এরও ভুলভ্রান্তি থাকা অসম্ভব নয়। আর তা দূর করতে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন অনুভূত হতে পারে।

 

আবার জাতীয় প্রয়োজনে সংবিধানকে যুগোপযোগী করার আবশ্যকতা দেখা দেয়। এ কারণে বিভিন্ন দেশের সংবিধান একাধিকবার সংশোধন করতে হয়েছে। ভারতের সংবিধান ৯৯ বার সংশোধন করা হয়েছে, যদিও সর্বশেষ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছেন।

 

’৭২-এর সংবিধানকে সংবিধান প্রণেতারা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান বলে অভিহিত করেন এবং এ নিয়ে গর্ববোধ করেন, কিন্তু এর দুর্বলতাগুলো উপেক্ষণীয় নয়। এ সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে বিশিষ্টজনেরা তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন।

 

অপর দিকে কারো কারো মতে, ’৭২-এর সংবিধানের সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করে প্রধানমন্ত্রীর হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান এবং ৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত করায় প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরশাসনের উদ্ভব ঘটেছে।

 

দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন করার সময় এ পদ্ধতির মধ্যে সংশোধনী আনার কিংবা সংস্কার করার সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। ফলে আবার এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতার পুঞ্জীভবন ঘটছে।

 

তিনি নির্বাহী বা সরকার প্রধান, আবার দলের প্রধান ও সংসদনেতা। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ঘটায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে সংবিধানে আবারো সংশোধন করার প্রয়োজনের কথা বিভিন্ন মহল থেকে উচ্চারিত হচ্ছে।

 

’৭২-এর সংবিধান সংসদ সদস্যদের নির্বাহী কর্মকাণ্ড সম্পাদনে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করে না। করে না বলেই বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ, পরিষেবা প্রদান ও ত্রাণসংক্রান্ত কাজে তাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

 

দেশের সাধারণ মানুষ এ ধারণা পোষণ করে যে, একটি নির্বাচনী এলাকার যাবতীয় কর্মকাণ্ডে এমপি হলেন মালিক-মোক্তার। তাকে ছাড়া এলাকা অচল। তিনি যেন নিজ এলাকার ‘চক্ষু, কর্ণ ও নাসিকা’। অথচ সংবিধানের পাঠ অনুযায়ী সংসদ সদস্যের কাজ হলো আইন প্রণয়ন। এ জন্য উন্নত দেশের নাগরিকেরা তাদেরকে আইন প্রণেতার বাইরে অন্য কিছু ভাবতে অভ্যস্ত নন।

 

আমাদের সংবিধানের এই ফাঁকফোকরের সুযোগে নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটারদের মন জয় কিংবা প্রভাবিত করার কৌশল হিসেবে ক্ষমতাসীনেরা সংসদ সদস্যদের অনুকূলে মোটা অঙ্কের টাকা, প্রকল্প ও ত্রাণ বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। বর্তমানে যেহেতু আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে সংসদে, সেহেতু এ ধরনের বরাদ্দ এ দলকেই বেশি সুবিধা এনে দিচ্ছে এবং তাদের ভোটের পাল্লাই বেশি ভারী। ফলে নির্বাচনী রাজনীতির প্রতিযোগিতায় অসমতা তৈরি হবে। ’৭২-এর সংবিধানের এই দুর্বলতা বা ত্রুটি দূরীকরণে এর সংশোধনের আবশ্যকতা রয়েছে।

 

’৭২-এর সংবিধান নিয়ে গণপরিষদের সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য ছিল না। এ কারণে প্রয়াত মান কেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংবিধানে সই দেয়া থেকে বিরত ছিলেন।

 

তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বলেছিলেন, ৭০ অনুচ্ছেদের মধ্যে এমন একটি অগণতান্ত্রিক বিধান রাখা হয়েছে, যা পৃথিবীর আর কোনো সংবিধানে নেই। একে গণতন্ত্রের ‘টুঁটি চেপে হত্যা’ বলে তিনি মত দিয়েছিলেন।

 

৭০ অনুচ্ছেদ দেশের গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করেছে বলে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন। সুতরাং ’৭২-এর সংবিধানও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়নি এবং সব নাগরিকের আশা-আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হয়নি এতে।

 

এ ছাড়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৫০টির মতো অনুচ্ছেদকে অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি দেশে দেশে স্বীকৃত ও ইতঃপূর্বে বিদ্যমান গণভোটের বিধান রদ করে সরকার জনগণের ক্ষমতা শুধু হরণই করেনি, তাদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছে।

 

পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে এক দিকে যেমন সংবিধান নিয়ে বিতর্ক আরো উসকে দেয়া হয়েছে, অন্য দিকে জাতির বিভাজনকে করা হয়েছে আরো তীব্র ও তীক্ষণ। পঞ্চদশ সংশোধনী আইনটি করাই হয়েছে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে।

 

একটি সংসদ অনাগত সব সংসদের ক্ষমতা ও গণ-আকাক্সক্ষাকে বারিত করতে পারে না। এ ছাড়া সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি সমাজতন্ত্র হলেও বাস্তবে বাংলাদেশে নিকৃষ্ট ধরনের পুঁজিবাদের দাপট চলছে। এটাও সংবিধানের একটি বিরাট অসঙ্গতি এবং এটি স্ববিরোধিতাও বটে।

 

’৭২-এর সংবিধানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিজেই তা যুৎসই মনে না করে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এক দিকে জাতীয় দলের নামে বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) গঠন করেন, অন্য দিকে প্রেসিডেন্ট-শাসিত সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। দীর্ঘ দিন এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশ শাসিত ও পরিচালিত হয়েছে।

 

এরশাদ সরকারের দমনপীড়নে মানুষ অতিষ্ঠ হলে অবশেষে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। এরপর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকালে প্রণীত রূপরেখার শর্ত পূরণকল্পে সংসদে সর্বসম্মতভাবে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার তথা ’৭২-এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন করা হয়, কিন্তু এর পরিণাম সুখকর নয়।

 

বাংলাদেশে আজ প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে এক ব্যক্তির শাসন। একই ব্যক্তি সরকারপ্রধান, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান। নেতাকর্মীরা, সংসদ সদস্যরা ও মন্ত্রীরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন না। ক্ষমতা কেন্দ্রীভবনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জনগণ খাবি খাচ্ছে। এ কারণে সংবিধান সংশোধনের তথা ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।

 

৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং প্রদেশ গঠনের দাবিও কোনো কোনো মহল থেকে উঠেছে। তাহলে ৭২-এর সংবিধান অলঙ্ঘনীয় ও নিখুঁত হলো কিভাবে? প্রকৃতপক্ষে ৭২-এর সংবিধান কোনো ধন্বন্তরি হওয়া সম্ভব নয়। আর এ কারণে সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে প্রয়োজনের তাগিদে সংবিধান সংশোধন করতে হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতেও হতে পারে। এটিকে আদি অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়।

 

উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে রাষ্ট্র ও সমাজের যে রূঢ় বাস্তবচিত্র উঠে এসেছে; এর পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

লেখক :

মো: মতিউর রহমান

সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • সবচেয়ে পঠিত

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ