শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

রোহিঙ্গা ও বিশ্ব মানবতা ও শেখ হাসিনা

অক্টোবর ৮, ২০১৭ 469 views 0
রোহিঙ্গা ও বিশ্ব মানবতা ও শেখ হাসিনা

সায়েক এম রহমান :

১. রোহিঙ্গা

রোহিঙ্গা  শব্দের উৎপত্তি ১৪৩৩ সালে । ম্রোহং শব্দ থেকে। বেশিরভাগ ইতিহাস বিদদের মতে ম্রোহং হল, মুহাম্মদ সোলেমান শাহের শাসনকালের রামু বা টেকনাফের একশত মাইলের ভিতরে মুহাম্মদ সোলায়মান শাহের আমলের রাজধানীর নাম। এই ম্রোহং শব্দটি তখনকার মুসলমানরা লেখা ও পড়ায় রোহাং উচ্চারণ করতেন।এভাবেই রোহাং থেকে রোহিঙ্গা নামকরন হয়।

 

রোহিঙ্গা আরাকানে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাঙ্গালী বসত স্থাপনকারী না। তারা হাজার বছর আগের আরাকানের স্থায়ী বাসিন্দা। এখানে তা পরিস্কার। আরও বলি, আরাকান বা আরাকানিরা বার্মার না এবং বার্মার কোন অংশও না। ইতিহাস বলে ১৭৮৪ সালে বার্মিজরা আরাকান দখল করে নেয়। যাহা আবার ১৮২৫ সালে ইংরেজরা দখল করে নেয়। তাহলে এখানে হিসাবের খাতায় পরিস্কার আরাকানে বার্মিজদের অবস্থান ৪৩ বৎসরের। এর আগে আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। বিশেষ ভাষা ভিত্তিক এই জন গোষ্ঠী ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন।

 

ইতিহাস আরও বলে সুলতানি আমলে কখনও কখনও আরাকান ছিল বাংলার আশ্রিত রাজ্য। আরাকানের রাজা বাদশাহরা মুসলিম নাম ব্যবহার করতেন এবং তাদের মুদ্রায়ও কালিমা অঙ্কিত ছিল। ভারতীয় ও বাঙ্গালী ও অন্যান্যরা তখন থেকেই আরাকানে বসবাস করতে থাকে। আরাকানের রাজসভায় অনেক ভারতীয়রা স্থান পায়। যেমন মধ্য যোগীয় বাংলা কবি মাগন ঠাকুর ও আলাওয়াল সহ অনেকেই ছিলেন।

Save-Rohinga

আরাকান মুলতঃ বার্মার দখলকৃত একটি দেশ। বার্মিজরা আরাকানের ইসলামি সব পরিচিতি মুছে ফেলে দিচ্ছে। তারা রাজধানী আকিয়াবের নাম পরিবর্তন করে রেখেছে সিট্রোয়ে। ১৯৭৪ সালে রাজ্যের নাম আরাকান থেকে নাম রেখেছে রাখাইন। এই ভাবে আরও অনেক ঐতিহাসিক নাম বদল করে দিচ্ছে। ১৯৮৪ সালে বৃটিশদের কাছ থেকে আরাকান স্বাধীন হয় এবং ১৯৫৪ সালে বার্মিজ প্রধানমন্ত্রী উনো রোহিঙ্গাদের স্বদেশী হিসাবে ঘোষনা দেয়। অতঃপর ভোটধিকার পেয়ে ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে আরাকানের ৭টি আসনে বিজয়ী হয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ।

 

কিন্তু ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুথখানের পর রোহিঙ্গাদের বহিরাগত হিসাবে ঘোষনা দেয় তৎকালীন সামরিক জান্তা। আর ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার নাগরিকত্ব আইন করে, সেখানে রাষ্ট্রীয় ভাষা না জানলে এবং আরও কিছু শর্ত লাগিয়ে দেয় (যাহা পুরন করতে সম্ভব না হয়) অর্থাৎ এই শর্তগুলা পুরন করতে না পারলে রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরন, রাজনৈতিক অধিকার এবং সম্পত্তি অর্জনের অধিকার বাতিল করা হয়। এই হল সংক্ষেপে মিয়ানমার সামরিক জান্তা সরকারের হাজার বছরের স্থায়ী বাসিন্দা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত করার ঘৃনিত পলিসি।

 

পাঠক, ওরা ভাষার পরিচয়ে বাঙ্গালী হতে পারে কিন্তুু তারা আরাকানের অবৈধ বসতি স্থাপনকারী না। রোহিঙ্গা হল হাজার বছরের আরাকানের স্থায়ী বাসিন্দা । বরং বার্মিজরাই অবৈধ। বার্মিজরাই অবৈধ দখলদার বাহিনী।

ARkan

আজ হাজার বছরের রোহিঙ্গা শব্দটি একটি চিৎকার, একটি কম্পন! আজ রোহিঙ্গা মানেই পৃথিবীর নিকৃষ্টতম ইতিহাস, গলা কেটে হত্যা, ধর্ষনের পর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা, হাতুড়ি দিয়ে পিষিয়ে হত্যা, স্বামী-স্ত্রীকে উলঙ্গ করে গাছে বেঁধে হত্যা। মানুষ মানুষকে যে হত্যা সিনেমায় দেখালো অসম্ভব, সে হত্যা মিয়ানমারের বর্বর সেনা বাহিনী ও মগদের দ্বারা দেখানো হয়েছে।

 

বিশ্বের নিকৃষ্টতম মিয়ানমার সেনা ও মগদের অত্যাচারে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিয়েছে। রোহিঙ্গারা আজ হাজার বছরের ভিটে মাটি ধনসম্পদ সব কিছু ছেড়ে জীবন বাঁচাতে বেশীর ভাগ ছুটে আসছে বাংলা দেশে।

 

২. বিশ্ব মানবতাঃ

প্রশ্ন গুলা কিন্তু মানবিকতার, শুধু ধর্মের নয়। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায়, মানবিকতার নয়,ধর্মেরই বটে। আমেরিকায় যখন ৫১জন সমকামীকে হত্যা করা হল, তখন সাথে সাথে বিশ্ব একযোগে কালো কাপড় বেঁধে শোক প্রকাশ করল। ফ্রান্সে যখন সন্ত্রাসী হামলা হল। তাৎক্ষণিক বিশ্ব বিবেক জেগে উঠল। কিন্তু মিয়ানমারের যখন হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হয়, তখন বিশ্ব মোড়লদের ভুমিকা হয় ভিন্ন কায়দায়। তখন বিষয়টা কি দাঁড়ায়? রোহিঙ্গারা মুসলিম তাইতো? (খৃষ্টীয়ান পোপ তো বলেই গেলেন রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়ার হওয়াতেই রোহিঙ্গাদের উপর এমন বর্বর পৈশাচিক কান্ড ঘটানো হচ্ছে। যাহা মোটেই উচিত নয়।) তাদের অপরাধ তারা মুসলিম।

Rohingga

পৃথিবীতে যত ধর্ম আছে কোন ধর্মেই মানুষ মানুষকে হত্যার স্বীকৃতি দেয়নি। প্রতিটি ধর্মই মানব ও মানবতার গান গেয়ে গেছে। কিন্তু কোথায় আজ ধর্মীয় মানবতা? কোথায় বিশ্বমানবতা? বিশ্ব মানবতা ও বিশ্ব বিবেক ও জাতি সংঘ কাদের জন্য তা এখানে পুরোপুরি পরিস্কার ।

 

৩. মুসলিম বিশ্বঃ

যখন রোহিঙ্গাদের ক্রন্দনে কাঁদছে আরাকানের আকাশ বাতাস, কাঁদছে অসহাস শিশু ও নারী পুরুষের গগন বিদারী আর্তনাদে সারা সারা মুসলিম জাহান, তখন সৌদি বাদশাহ সালমান ৮০ কোটি টাকার বিলাস বহুল সফর ও ভোগ বিলাসে মগ্ন মরক্কোতো। তখন ওআইসি সহ মুসলিম সংগঠন ও মুসলিম নেতাদের আগাইয়া আসতে দেখা যায়নি। তখন একমাত্র একজনই বিশ্বের রক্তচোষা সব দানব নেতাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে এসে মানবতার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন এমিলি এরদোগান। অতঃপর রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের খবর সারা বিশ্ব মিডিয়ায় সয়লাভ হলেও এই জাতিগত নিধন ও বর্বোরোচিত হত্যা কান্ড সম্পর্কে অনেক আগ থেকে অবগত ছিল বিশ্ব মোড়ল দেশ ও জাতি সংঘ।

Rohingga kill

এখন দৃশ্যপট বলে পুর্বের ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা ইস্যু ধামাচাপা দিতে ঘৃণ্য কৌশলে হাঁটছে মোড়ল দেশ ও জাতি সংঘ। ঐদিকে সম্প্রতি যোগ হয়েছে চীনের মুসলমানদেরকে পবিত্র কোরআন শরীফ ও জায়নামাজ পুলিশের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ। অনথ্যায় তাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।

 

বিশ্ব মুসলিম নেতারা যখন নিশ্চুপ তখন সেনেগালের ফুটবল তারকা একজন ব্যাক্তি “দেম্বাবা” নিদের্শনার প্রতি উত্তর টুইট করে তার ইমানি শক্তির পরিচয় দিয়েছেন । টুইটে তিনি বলেছেন যদি তারা জানত যে, মুসলিমরা মেঝেতে নামাজ পড়তে পারে এবং মিলিয়ন মিলিয়ন মুসলিম কোরআন না খুলে মুখস্থ পড়তে পারে, তখন সম্ভবতঃ চীন কর্তৃপক্ষ মুসলমানদের হ্রদপিন্ড তাদের কাছে খুলে দেওয়ার আদেশ দিত।

Arkan fire

কিন্তু এখন প্রশ্ন মুসলিম বিশ্ব নেতা এবং মুসলিম বিশ্ব সংগঠন আজ কোথায়? কোথায় মুসলিম বিশ্ব বিবেক? ঐসব অপদার্থ নামধারী মুসলিম শাসক ও তাবেদার পাগড়ীওয়ালাদেরকে ধিক জানাই, তাদেরকে মুসলিম জনরোষে ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়।

 

৪. শেখ হাসিনাঃ

যখনই এমিলি এরদোগান নির্যাতিত রোহিঙ্গাদেরকে দেখার জন্য পাঁচ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসলেন আর তুরস্ক সহ বিভিন্ন দেশ ত্রাণ যাত্রা শুরু করল। লক্ষ করে থাকবেন ঠিক তখনই হাসিনা সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে হঠাৎ গিয়ার চেইনজ করে রোহিঙ্গাকে পুঁজি বানিয়ে বিভিন্ন ফায়দা লুটার চেষ্টায় রত হলেন।

 

জাতি দেখেছে প্রথম দিকে আরাকানের অসহায় নারী পুরুষ ও নিষ্পাপ শিশুদের আর্তনাদে কাঁপছিল সারা জাহান তখন ঐ অসহায় মানুষরা মুসলিম দেশ জেনে পাগলের মত ছুটে আসছিল বাংলাদেশের দিকে একটু আশ্রয় চেয়েছিল শুধু বাঁচার জন্য। সারা জাতিও ছিল তাদের আশ্রয়ের পক্ষে কিন্তু হাসিনা সরকার তখন তাদের পুষব্যাক করেছিল। অনেক নৌকা পাড়ে না তোলায় মানুষ সহ ডুবে মরছিল। এখানেই ক্লান্ত নয় ভারত ও মিয়ানমারের মত বাংলাদেশ থেকে তাদের উপর গুলি পর্যন্ত করা হয়েছিল। এমনকি সুঁচি ও মোদির সাথে সুর মিলিয়ে রোহিঙ্গদেরকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী পর্যন্ত আখ্যা দিয়েছিল। কিন্তু এখনকার আচরন আবার দরদে ভরপুর এখন শেখ হাসিনা বড় গলায় বলছেন ষোল কোটি মানুষকে তিনি খাওয়াতে পারলে, দশ লাখ মানুষকে কেন খাওয়াতে পারব না। মানুষজন এখন বলছে সবই মতলব। এসবই ভন্ডামী এবং দ্বিচারিতা পুর্ণ।

Sheikh hasina

তাই আজ হাসিনা সরকার প্রায় পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গা শরনার্থী আশ্রয় দিয়েও বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত না হয়ে হয়েছেন লজ্জিত। কারন, প্রথমতঃ দ্বিচারিতা, অপকৌশল ও নতজানু পররাষ্ট্র নীতি।

 

দ্বিতীয়তঃ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তার সরকারের অগ্রহন যোগ্যতা। লক্ষনীয় শেখ হাসিনা সদ্য যুক্তরাষ্ট্র সফরে বিশ্ব নেতাদের কাছে হয়েছেন অপমানিত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশী ও বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে হয়েছেন লাঞ্চিত।

 

পাঠক, হাসিনা সরকারের দ্বিচারিতা, অপকৌশল ও নতজানু পররাষ্ট্র নীতির কারনে জাতি আঁতঙ্কিত। ষোল কোটি লোককে খাওয়াতে পারি আর দশ লাখ লোককে খাওয়াতে পারব না কেন? এটা ঠিক নয়।  খাওয়ানো সমস্যা সমাধান নয়। সেইফ জোন ও সমস্যা সমাধান নয়। সমস্যা সমাধান হল- রোহিঙ্গাদের তাদের ভিটে মাটিতে দক্ষ কুটনৈতির মাধ্যমে ফেরত পাঠানো। যে ভাবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে দক্ষ কুটনৈতিকতার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও তাহার আমলে যেমনি রোহিঙ্গাদের পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন শেখ হাসিনা কি পারবেন?

 

সায়েক এম রহমান লেখক ও কলামিষ্ট

সায়েক এম রহমান
লেখক ও কলামিষ্ট

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • সবচেয়ে পঠিত

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ