শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা বলে সমলোচনা

ডিসেম্বর ১৫, ২০১৪ 29 views 0

মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা বলে সমলোচনা করে গোলাম আজম নিজেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজাকার, আলবদর ও আলসামস’এর মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত ‘দৈনিক সংগ্রাম’এর ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বরের সংখ্যা থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ১৬ নভেম্বরের সংখ্যায় ‘কোন পূর্ব পাকিস্তানীকে প্রধানমন্ত্রী পদ দেয়া ইনসাফের দাবী’ শিরোনামে গোলাম আজমের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়।
তাতে গোলাম আজম ‘ইনসাফের দাবি দেশের সংহতি ও অখন্ডতার স্বার্থে কোন একজন পূর্ব পাকিস্তানীকে অবশ্যই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ প্রদান করতে হবে’ বলে বিবৃতি প্রদান করেন। এর মাধ্যমে তিনি যে নিজেকেই বোঝাতে চেয়েছেন, বিষয়টি তখন সবার কাছে পরিস্কার হয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধকালীন দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এমন বিভিন্ন সংবাদ নিয়ে আলী আকবর ঢাবি ‘দৈনিক সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভূমিকা’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। সেই গ্রন্থে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বাঙালী জাতিকে ধ্বংস, বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতি থেকে চিরতরে উৎখাত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দেবার ইয়াহিয়া খানের নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চ লাইট’এর দুই পরামর্শক জুলফিকার আলী ভুট্টো ও গোলাম আজম তখন নিজেরাই প্রধানমন্ত্রীত্বের ক্ষমতার লোভে উন্মত্ত হয়ে একে অন্যের বিষোদগারে লিপ্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর লোভে তৎকালীন বাংলাদেশের জামায়াত ইসলামের আমীর গোলাম আজম নিজেকে পূর্ব পাকিস্তানী হিসেবে দাবি করেন এবং ইনসাফের কথা বলে আওয়ামী লীগের ৮১ জন জাতীয় পরিষদের সদস্যদের সমর্থনও আশা করেন।
এ প্রসঙ্গে গ্রন্থের লেখক আলী আকবর ঢাবি বলেন, ২৫ মার্চ ‘ক্র্যাক ডাউনে’র পর জুলফিকার আলী ভুট্টো ও গোলাম আজম পর্দার অন্তরালে নতুন খেলা শুরু করে। এ সময় তাদের পরামর্শে সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার ও তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক পরিষদের ১৯৪ জন সদস্যের পদ শূন্য ঘোষণা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে সাধারণ শত্রু হিসেবে মোকাবেলার জন্য এই সামরিক জান্তা কুচক্রী গোলাম আজম ও ভুট্টোর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে গ্রন্থে আরো বলা হয়েছে, ভুট্টো ধরেই নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ বেআইনী ঘোষিত হওয়ার ফলে পার্লামেন্টে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তিনি পাচ্ছেন। কিন্তু গোলাম আজমের কুটচালে তার সমস্ত স্বপ্ন ভেস্তে যায়।
ঢাবি বলেন, গোলাম আজম পাকিস্তানপন্থি ৬ দলকে একত্রিত করে একটি জোট গঠন করেন এবং সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার সঙ্গে আতাঁত করে পূর্ব পাকিস্তানের শূন্য ঘোষিত আসনে প্রহসনের উপনির্বাচনের আয়োজন করে। এতে রাজাকার গোলাম আজম জোটের প্রায় সকল প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করে নিয়ে আসেন। অপর দিকে ভুট্টোর পিপলস পার্টিকে শূন্য হাতে ফিরতে হয়।
তিনি বলেন, সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া তখনও আওয়ামী লীগের ৮১ জন জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ বহাল রাখায় গোলাম আজমের নেতৃত্বাধীন ৬ দলীয় জোট কিংবা ভুট্টোর পিপলস পাটি কেউই নিরঙ্কুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ঝুলন্ত পার্লামেন্টের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের ৮১ সদস্য সরকার গঠনে ভারসাম্য শক্তি হিসেবে পরিগনিত হয়। তখন গোলাম আজম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন এবং আওয়ামী লীগের ভারসাম্য ভোট পাওয়ার জন্য ইনসাফের কথা বলে উপরোক্ত বিবৃতি প্রদান করেন।
আলী আকবর ঢাবি বলেন, আঞ্চলিকতার দাবি তুলে পূর্ব পাকিস্তানীদের অধিকার আদায়ে বঙ্গবন্ধু যখন মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশ দেন, তখন বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদি নেতা ও রাষ্ট্রদ্রোহী বলে সমালোচনা করতে ছাড়েননি গোলাম আজম।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লোভে এই রাজাকার নিজেকে পূর্ব পাকিস্তানী হিসেবেই দাবি করে আঞ্চলিকতার ধুয়া তুললেন। ভন্ডামী আর কাকে বলে!
তিনি বলেন, ক্ষমতার লোভে গোলাম আজম ইসলামের ঠিকাদারি ও দ্বিজাতিতত্ত্ব ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ করেই একজন পূর্ব পাকিস্তানী বনে গেলেন। দৈনিক সংগ্রাম এ সময় গোলাম আজমের বিবৃতি ও বক্তব্যকে সমর্থন করে ১৯ নভেম্বর সংখ্যার প্রথম পাতায় ‘আওয়ামী লীগের বহাল সদস্যরা এখন কি করবেন?’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে উল্লেখ আছে ‘পূর্ব পাকিস্তানীদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে দেশের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানীদের হাতেই দিতে হবে। এজন্য পিডিপি প্রধান নূরুল আমীন ও প্রাদেশিক জামায়াত প্রধান গোলাম আজমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ একজন পূর্ব পাকিস্তানীকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে প্রতিষ্ঠিত করার জনপ্রিয় দাবি উত্থাপন করেছেন।’
ঢাবি বলেন, গোলাম আজমসহ ওই রাজাকার কুচক্রী মহল এবং তাদের মুখপাত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’ তখন বেমালুম ভুলে গেলেন বঙ্গবন্ধুও একজন পূর্ব পাকিস্তানী ছিলেন এবং ৭০ এর নির্বাচনে নিরঙ্কুষ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করেই প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবিদার ছিলেন।
তিনি বলেন, গোলাম আজম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌঁড়ে ভুট্টোর সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য আবার নির্লজ্জের মত বললেন, ‘ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী হলে একজন পূর্ব পাকিস্তানীর প্রেসিডেন্ট হওয়া উচিত।’ গোলাম আজমের বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক সংগ্রাম ২৭ নভেম্বর সংখ্যার প্রথম পাতায় এ সংবাদ পরিবেশন করে। তাতে গোলাম আজম বলেন, ‘ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হতে চাইলে, তার পক্ষে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এই মর্মে একটি ঘোষণা আদায় করা উচিত যে, সে অবস্থায় একজন পূর্ব পাকিস্তানী দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন।’ ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় গোলাম আজম এ বক্তব্য প্রদান করে বলে বইয়ে লেখক উল্লেখ করেন। -

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ