বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বিবিসি খ্যাত সাহসী দেশপ্রেমিক মুক্তিসেনানী সাংবাদিক সিরাজুর রহমানও স্মৃতি হয়ে গেলেন

জুন ১২, ২০১৫ 42 views 0

এম এ সালাম, লন্ডন : বিবিসি খ্যাত সাহসী দেশপ্রেমিক মুক্তিসেনানী সাংবাদিক সিরাজুর রহমানও স্মৃতি হয়ে গেলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় লন্ডনের রয়েল ফ্রি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

 

বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতা জগতের এই উজ্বল নক্ষত্রের জন্ম ১৯৩৪ সালে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার লক্ষ্মীপুরে। বিবিসি বাংলা বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ইন্তেকালের সময় তিনি স্ত্রী সোফিয়া রহমানকে রেখে গেছেন। তার এক পুত্র ও কন্যা আগেই ইন্তেকাল করেন। তিনি দীর্ঘদিন ফুসফুসের রোগে ভুগছিলেন।

 

বিবিসি খ্যাত সিরাজুর রহমানের কণ্ঠস্বর বাংলাভাষাভাষী রেডিও শ্রোতার অতি পরিচিত। ‘সিরাজুর রহমান বলছি- লন্ডন থেকে’ তার এ কণ্ঠস্বর বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

 

কৈশোরে তার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি হয় কলকাতার দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। এরপর তিনি পয়গাম, ইত্তেফাক, মিল্লাত প্রভৃতি পত্রিকায় কাজ করেন। সেই থেকে আর সাংবাদিকতার জগত ছেড়ে চলে যাননি। পরিবর্তন ঘটেছে মাধ্যমের। ১৯৬০ সালে তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগদান করেন।

 

৩৪ বছর তিনি বিবিসি বাংলা বিভাগে কাজ করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষ তার মুখে খবর শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতো। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক ঘটনার সাক্ষী। মাওলানা ভাসানী,  শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো।

 

তিনি বিবিসি থেকে অবসর নেন ১৯৯৪ সালে। এরপর থেকে তিনি সংবাদপত্রে কলাম লেখা শুরু করেন। জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক বিষয়ে লিখতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নয়াদিগন্তে নিয়মিত কলাম লিখেছেন।

 

সিরাজুর রহমানের পিতা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি পরিবারের সাথে ঢাকা ফেরেন। কলকাতাতে মেট্রিক পরীক্ষার আগেই সাংবাদিকতা শুরু করেন। দেশে ফেরার পর ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। এ সময় তিনি ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সঙ্গীতের অফিসিয়াল যে মিউজিকটি বাজানো হয় তা তৈরির পেছনে মূল ভূমিকা রাখেন সিরাজুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সংবাদ তার কণ্ঠেই প্রচার করেছিলো বিবিসি।

 

সিরাজুর রহমান অনেকগুলো বই লিখেছেন। এর মধ্যে ‘প্রীতি নিন সকলে’ ’বিবিসির দৃষ্টিতে বাংলাদেশ : স্বাধীনতার পনের বছর’, ‘রাজনৈতিক প্রবন্ধ’, ‘জেন অস্টিনের অনুবাদ গ্রন্ধ প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, ‘আন্তন চেখভের নাটক’, ‘চার্লস ডিকেন্সের গ্রেট এক্স্রপেকটশন্স’, ‘শার্লেটে ব্রুন্টির জেন এয়ার’ উল্লেখযোগ্যে। এছাড়া সিরাজুর রহমান তার আত্মজীবনী ‘এক জীবন, এক ইতিহাস’ লিখে গেছেন।

 

লন্ডন থেকে তাইছির মাহমুদ জানান, সাংবাদিক সিরাজুর রহমান সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় নর্থ লন্ডনের রয়েল ফ্রি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তার স্ত্রী সফিয়া রহমান জানান, সকালে তিনি হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন। এমন সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টেলিফোনে তাকে সিরাজুর রহমানের অবস্থার অবনতির কথা জানান। এ সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। কিন্তু তিনি পৌঁছার আগেই সিরাজুর রহমান মারা যান। ময়না তদন্ত শেষে তাকে স্থানীয় হেন্ডন কবরস্থানে দাফন করা হবে। মৃত্যুর আগে তিনি নিজের ও স্ত্রীর জন্য সেখানে কবরের জায়গা কিনে রেখেছিলেন। এখানেই তার ছেলে ও মেয়ের কবর রয়েছে।

 

সিরাজুর রহমান স্বপরিবারে নর্থ লন্ডনের হেনডন এলাকায় থাকতেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিলেন। ২০১১ সালে ছেলে সাইফুর রহমান ও ২০০২ সালে মেয়ে নাজনিন রহমান মারা যান। এরপর তিনি দুই নাতি তানভির রহমান ও ছল রহমানকে নিয়ে একই বাসায় থাকতেন।

 

সাংবাদিক জগতের কিংবদন্তি বিবিসি খ্যাত সাংবাদিক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সিরাজুর রহমানের জানাযা লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, স্বাধীনতার ঘোষকের সন্তান, ৭১’র শিশু মুক্তিযোদ্ধা, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডনে ১১ই জুন সময় দুপুর ১টায় ওয়েস্ট লন্ডনের হেন্ডন মসজিদে এ নামজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।

 

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সিরাজুর রহমান। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষ তার মুখে খবর শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতো। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক ঘটনার সাক্ষী।  মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিলো।

 

কিন্তু তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোন প্রকার শোকবার্তা কিংবা লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কামিশনের পক্ষ থেকে সন্মানসূচক জাতীয় পতাকা প্রেরণ করা হয়নি। পাকিস্তান সেনা বাহিনীর আত্মসমর্পণের খরবটি সিরাজুর রহমানের কন্ঠেই বিবিসি সারাবিশ্বে প্রচার করেছিল। তাঁর কণ্ঠেই বাংলাদেশের বিজয়ের সংবাদ শুনতে পায় বিশ্ববাসী।

 

সিরাজুর রহমান ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের অগ্রভাগে ছিলেন। পাকিস্তান সেনা বাহিনীর আত্মসমর্পণের খরবটি তাঁর কন্ঠেই প্রচার করেছিল বিবিসি। তাঁর কণ্ঠেই বাংলাদেশের বিজয়ের সংবাদ শুনতে পায় বিশ্ববাসী। ব্রিটিশ আমলের পর ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা শুরুর প্রতিকৃতদের অন্যতম একজন তিনি। সর্বশেষ ৩৪ বছর কাটিয়েছেন বিবিসি রিডিওর লন্ডনে প্রধান কার্যালয়ে। গত ২০ বছর আগে অবসর নেন বিবিসি থেকে।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ