শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

‘নাগরপুরে দরিদ্রতাকে জয় করে ৮ এসএসসি শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ লাভ’

জুন ১০, ২০১৫ 69 views 0
‘নাগরপুরে দরিদ্রতাকে জয় করে ৮ এসএসসি শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ লাভ’

বিভাস কৃষ্ণ চৌধুরী, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি : টাঙ্গাইলের নাগরপুরে ৮ অদম্য মেধাবী দারিদ্রকে জয় করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে। অভাব অনটনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওরা আঁধার ঘরে আলো জালিয়েছে। এরা কেউ দিন মজুর, ফুটপাতের চা দোকানি কারখানা শ্রমিকের সন্তান আবার কেউ পিতৃহীন। কষ্টের অন্ত নেই। অভাব ওদের নিত্য সঙ্গী। দু’বেলা দু’মুঠো ভালভাবে খাবার জোটেনা তাদের ভাগ্যে। চাহিদা মাফিক জোগাড় হয়নি পোশাক। তবুও দমে যায়নি। স্বপ্ন পূরণের সংগ্রামে হার মানেনি দারিদ্রের কাছে।

 

এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে হাসি ফুটিয়েছে দুঃখি মা-বাবার মুখে। শিক্ষা জীবনের প্রথম এ সাফল্য তাদের দু’চোখে এখন এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। এস্বপ্ন বাস্তবায়নে অভিভাবকের মনে শংকার পাহাড়। অর্থাভাবে ভাল কলেজে ভর্তি ও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দুঃশ্চিন্তার অন্ত নেই তাদের। অনেকের ডাক্তার, প্রকৌশলী ও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য। এ অবস্থায় সমাজের বিত্তবানরাসাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেই ওদের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে।

 

জিপিএ ৫ পাওয়া জনি মিয়া এবার এসএসসি পরীক্ষায় নাগরপুর নয়ানখান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। জনিকে ছোট রেখে মারা যান বাবা পান্নু মিয়া। এর পর থেকে বহু কষ্টে মা হাসনা বেগম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। ৬ষ্ট শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় পিতৃহীন মেধাবী জনি নজরে পড়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের। বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পায় সে। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে। খেয়ে না খেয়ে চলে তার শিক্ষা জীবন। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়া হয়নি। জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করলেও উচ্চ শিক্ষা নিয়ে দুঃচিন্তায় পড়েছে জনির মা হাসনা বেগম।

 

তামান্না খাতুন এবার খাষ শাহজানী এমএ করিম উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি তে জিপিএ-৫ পেয়েছে ।তামান্নার বাবা ইয়াকুব আলী কৃষক। মা নার্গিস আক্তার গৃহিনী। নাগরপুর উপজেলার চরাঞ্চল ভাড়রা ইউনিয়নের নদী ভাঙ্গন এলাকা মারমায় তাদের অভাবের সংসার। জমিজমা সব রাক্ষুসে যমুনায় গ্রাস করে নিয়েছে। অন্যের জমিতে কাজ করে সামান্য আয়ে কোন রকমে চলে তাদের সংসার। মেয়ের জন্য ভালো কোন গৃহশিক্ষক রাখতে পরেননি। তাই তামান্না জিপিএ ৫ পেলেও পরিবারের আশংকা শেষ পর্যন্ত তামান্না খাতুনের ইচ্ছা তারা পূরণ করতে পারবে তো ?

 

নাগরপুর উপজেলার নয়ানখান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে মো. রাসেল মিয়া। বাবা সাহাদৎ হোসেন ও মা হালিমা বেগমের অভাবের সংসারে অতিকষ্টে পড়াশোনা করছেন। একখন্ড বসত ভিটা ছাড়া আর কোন জমি নাই। তাদের অদম্য মেধাবী রাসেলের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে মা হালিমা বেগম। শেষ পর্যন্ত মেধাবী ছেলে রাসেল উচ্চ শিক্ষা লাভ করতে পারবে তো ? এই আশংকা তাড়া করে বেড়াচ্ছে অসহায় বাবা-মাকে।

 

টাঙ্গাইলের নাগরপুর নয়ান খান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে সাদিয়া আক্তার মৃদু। সে উপজেলার বেকড়া ইউনিয়নের সাতগাছা গ্রামের শ্রমিক নবনুর রহমানের মেয়ে । মা মমতাজ বেগম গৃহিনী। কারখানায় সামান্য বেতনের শ্রমিক নবনুর সংসার চালিয়ে মেয়েকে পড়াশোনা করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে । বাবা-মার অনেক আশা মেয়েকে ডাক্তার বানাবে। কিন্তু অদম্য মেধাবী মৃদুর স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের দরিদ্রতা।

 

সুবর্না আক্তার এবারের এসএসসি পরীক্ষায় খাষ শাহজানী এমএ করিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। মেয়ের এ সাফল্যে আনন্দের পাশাপাশি দুশ্চিন্তারও অন্ত নেই। অভাব অনটনের সংসার তার ওপর সর্বনাশা যমুনা নদী গিলে খেয়েছে সবটুকু জমি। নদী ভাঙ্গন এলাকা আগদিঘুলিয়া গ্রামের শেষ অবলম্বন বসতভিটা আঁকড়ে ধরে জীবনসংসারে যুদ্ধ করে চলছে বাবা গোলাম হোসেন ও গৃহিনী মালাভলী আক্তার। অন্যের জমি চাষ করে চলে তাদের সংসার। অভাব অনটনের মধ্যেও হাল ছাড়েনি। মেয়ের কৃতিত্বে আনন্দে আত্মহারা বাবা-মা। শুধু টাকার অভাবে মেধাবী মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার আশংকা করছেন।

 

নাগরপুর নয়ানখান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরিক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সুরমা আক্তার। মেঘনা গ্রামের হতদরিদ্র আনোয়ার হোসেন মা জনতা বেগম গৃহিনী। বসতভিটায় থাকার মত অবলম্বন একটি ছাপড়া ঘর। মা- বাবার সাথে ছোট্ট ছাপড়া ঘরে বসবাস করতে হচ্ছে মেধাবী সুরমা আক্তারকে।

 

দু’বেলা ভালমতো খাবার জোটে না, ইচ্ছে থাকা সত্বেও ভালো পোশাক জোগাড় করতে পারে না তার অভিভাবক। গ্রামের ফুটপাতে পান বিড়ি দোকান করে সংসার চালানোই এখন দায় হয়েছে বাবা আনোয়ার হোসেনের। এত কষ্টের পরেও থেমে থাকেনি সুরমার পড়া লেখা। পরিবারের আশাÑ সুরমা একদিন অনেক বড় হয়ে তাদের মুখ উজ্জল করবে। সুরমা কি সত্যই পারবে তার স্বপ্ন পূরণ করতে নাকি মাঝ পথেই থেমে যাবে।

 

ঘুনিপাড়া আব্দুর রশিদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে তারিন আক্তার। উপজেলার কাচপাই গ্রামের কৃষক হায়দার আলীর মেয়ে । মা ছালেহা বেগম গৃহিনী । বড় বোন শারমিন আক্তার ২০১২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে। বড় বোনের লেখাপড়া আর সংসারের খরচ জোগান দিতে বাবা-মাকে সীমাহীন পরিশ্রম করতে হচ্ছে। কিভাবে তারিনের উচ্চ শিক্ষার খরচ জুগাবে অসহায় বাবা-মা। শেষ পযর্ন্ত লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারবে কি না এই টেনশনে রয়েছে মেধাবী তারিন আক্তার।

 

২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নাগরপুর নয়ান খান মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে মিম । আত্ম প্রত্যয়ী মেধাবী মিম দারিদ্র্যকে জয় করে জীবনের প্রথম সফল্য লাভ করলেও অর্থের অভাবে তার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার আশংকা করছে দিনমজুর বাবা মিজানুর রহমান ও গৃহিনী মা হালিমা বেগম। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্ট করে মেয়ে মিমকে লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন দিনমজুর বাবা মিজানুর রহমান। ভাল কলেজে ভর্তি ও লেখাপড়ার খরচ কিভাবে জোগান দিবে এ ভাবনা এখনই তাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে ।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ