শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সন্তানের মতো লালন পালন করছেন একটি অজগর সাপ

জুলাই ৪, ২০১৫ 200 views 0

প্রথম নিউজ প্রতিনিধি, রাঙামাটি : সাপ দুই অক্ষরের এই নাম যা শুনলেই আতঙ্কে মানব শরীর শিউরে উঠে। ভয়ে ভেতরটা শুকিয়ে যায়। তারপর যদি সাপটির হয় অজগর তাহলেতো আর রক্ষা নেই। এমনসব ধারণাকে পাল্টে দিয়ে নিজের ঔরসজাত সন্তানের মতোই দীর্ঘ নয় বছর ধরে এই ভয়ানক প্রাণীটিকে আগরে রেখেছেন রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলা সদরের বাসিন্দা সাদেক আলী ওরফে সাদিম। এই নয় বছরে সামান্য কয়েক সূতা লম্বা এই অজগরের বাচ্চাটিকে আদর যন্ত দিয়ে লালন পালন করে যাচ্ছেন তিনি।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, অন্তত ১০ ফুট লম্বা এই সাপটি এতটাই নিবিড়ভাবে গ্রহণ করেছে যে সাদেক আলী ছাড়া অন্য কারো হাতে খায় না অজগরটি। তার কথামতো মুখে চুম্বনও দেয় নয় বছর বয়সী ১০ ফুট লম্বা মোটামুটি বিশাল আকৃতির এই অজগর সাপটি। যার জন্মই জঙ্গলে সে কিনা জঙ্গলে থাকতেও চায় না, আবার জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসলে নিজে থেকেই ফিরে আসে তার লালন কর্তার বাসায়। সেখানেই মানুষের সহচরে থাকতে ভালোবাসে সে। এই বয়সে একটি জঙলী অজগর সাপ আস্ত ছাগল/হরিণ খেয়ে ফেলতে সক্ষম হলেও সাদেক আলীর অজগরটি প্রতি দুইদিনে এক থেকে দুই কেজি মাছ খেয়েই কাটিয়ে দেয়।

 

সাদেক আলী’র বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক একর জায়গার উপর একটি কাঠের ঘেরা বসতঘর ও বাঁশের বেড়া দেওয়া একটি রান্না ঘর। আর বাড়ির উঠানে রয়েছে কাঠ দিয়ে তৈরি ছোট্ট দুইটি ঘর। যার একটিতে থাকে মুরগি ও অপরটিতে রয়েছে তিনটি অজগর সাপ। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল তিনটি অজগর মাথা তুলে চারদিক দেখছে। এখন খাবারের সময়, ওরা তাই অপেক্ষা করছে সাদেকের জন্য। খানিক পরেই তিনি এলেন মাছ নিয়ে। সাপটিকে দিতে শুরু করলেন মাছ। জানান, তিনি মুখে তুলে না দিলে সাপগুলো খায় না।

 

বেদে নন, নন সাপুড়েও তবে কীভাবে পোষ মানালেন সাপগুলোকে? এমন প্রশ্নের জবাবে সাদেক আলী জানান, শখের বশেই তার সাপ লালন-পালনের শুরু। বাসায় রান্নার কাঠ জোগাড় করতে ঘুরতেন পাহাড়ে পাহাড়ে। তখন দেখতেন অনেকে সাপ ধরে নিয়ে যাচ্ছে খাওয়ার জন্য। মায়া হলো তার। কিছু একটা করার কথা ভাবলেন। এভাবেই কাটতে লাগল দিন। ১৯৮৪ সালের কথা। একদিন পাহাড়ে কাঠ আনতে গিয়ে চোখের সামনে পড়ল একটা শঙ্খিনী সাপ। ভয়ডর ভুলে প্রায় সাড়ে তিন হাত লম্বা সাপটিকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন বাড়িতে। পরম ভালোবাসায় পুষতে শুরু করলেন সাপটিকে। ইচ্ছে ডিম ফুটিয়ে বংশ বাড়িয়ে আবার জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া।

 

কিন্তু পারলেন না বেশি দিন। তিন মাসের মাথায় পরিবারের চাপের মুখে সাপটিকে ছেড়ে দিয়ে আসতে হয় জঙ্গলে। একবার চেষ্টা করেও পারলেন না। কিন্তু দমে গেলেন না। একদিন বনে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে পেয়ে গেলেন প্রায় ১০ কেজি ওজনের একটি অজগর। অসম্ভব জেদি ছিল এটি। অনেক কৌশলে সঙ্গে নিয়ে আসেন বাসায়। অতি যত্নে লালন-পালন করতে শুরু করেন। কিন্তু বনের সাপকে পোষ মানানো কি এত সহজ! অজগরটি একের পর এক বাড়ির মুরগি খাওয়া শুরু করল। তবু হাল ছাড়েননি।

 

সাপটিকে দিতে শুরু করলেন মাছ। ১৯৯৯ সালের কথা। একদিন বাজার ঘুরেও মাছ পেলেন না। এদিকে মামলার কাজে তাকে যেতে হবে চট্টগ্রাম। কয়েক দিন তিনি থাকবেন না। সাপটিও না খেয়ে থাকবে, এই ভেবেই খাওয়ালেন পাঁচ কেজি গরুর মাংস। চট্টগ্রাম গিয়ে খবর পেলেন সাপটি বাসা ভেঙে পালিয়েছে।

 

প্রায় নয় বছর আগের কথা। লংগদুর সিজক পাহাড় থেকে আবারও তিনি ধরে আনলেন অজগর সাপের একটি বাচ্চা। সাপটি মেয়ে হলেও সাদেক তার নাম দেন বুশ। ঠিক নিজের সন্তানের মতো করেই বুশকে বড় করেছেন সাদেক। নয় বছর বয়সেও এখনো ধরে ধরে খাইয়ে না দিলে খেতে পারে না বুশ। চার-পাঁচ বছর আগে বন থেকে একটি পুরুষ অজগর ধরে আনেন তিনি। সেটিকে ছেড়ে দেন বুশের সঙ্গে। ছেলে সাপটির নাম দেয়া হয় সাদ্দাম।

 

সাদ্দাম কিছুদিন পর খাঁচা ভেঙে পালালেও বুশ একসময় ১৮টি ডিম পাড়ে। চলতে থাকে ডিমসহ বুশের পরিচর্যা। একসময় ১১টি ডিম ফুটে বের হয় বাচ্চা। এর মধ্যে আটটি সাপের বাচ্চাকে ছেড়ে দিয়ে আসেন কালাপাহাড়ে। এরপর বুশ ও তার তিন বাচ্চাকে লালন-পালন শুরু করেন সাদেক। কিছুদিন পর মাছ কেনার টাকা জোগাড় করতে না পেরে দুটি বাচ্চাকে ছেড়ে দেন পাহাড়ে। বর্তমানে বুশ ও তাঁর ছানা ছাড়াও আরও একটি অজগর কিনে লালন-পালন করছেন। এর মধ্যেই লংগদু রেঞ্জের বন বিভগের হাতে তুলে দিয়েছেনে তিনটি সাপ।

 

সাদেক আলী চাইলে সাপ দিয়ে খেলা দেখিয়ে আয় করতে পারতেন প্রচুর অর্থ। কিন্তু এসবে কোনো লোভ নেই তার। বর্তমানে কাজ করছেন ভিডিপিতে হাবিলদার হিসেবে। সেই সঙ্গে করছেন টুকটাক চিড়াই কাঠের ব্যবসা। ভয়ংকর প্রাণী সাপের প্রতি অন্য রকম ভালোবাসা থাকলেও সংসারমুখী সাদেক। স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়েসহ সুখের সংসার তার। তবে বেচারার একটাই দুঃখ তার স্ত্রী সাদেকের সাপ পালনে সহযোগিতা করেন না এবং এধরণের কর্মকাণ্ড সহ্যও করেন না।

 

সাদেক আলী জানান, সাপ যত ভয়ংকরই হোক না কেন, ইচ্ছে থাকলেই তাকে পোষ মানানো সম্ভব। ভবিষ্যতে আরও বড় সাপের খামার করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। আর এই জন্য সাদেকের আশা, সরকার যদি তাকে একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতো তাহলে পাহাড় থেকে বিলুপ্ত হতে চলা বিভিন্ন প্রজাতির সাপ সংরক্ষণে তিনি অবদান রাখতে পারতেন।

 

এদিকে সাদেক আলীর এমন কর্মকাণ্ডে গর্ববোধ করেন বলে জানালেন লংগদু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন। তিনি জানান, এই অর্থবছরে বরাদ্ধ এলে সাদেক আলীকে কিছু সাহায্য দিবেন তিনি। যাতে করে এই সাপগুলোকে ভালোভাবে কিছু খাবার দিতে পারে এবং লালন-পালন করতে পারে। এছাড়া যদি সম্ভব হয় তাকে একটি ঘর করে দেওয়ারও প্রতিশ্রুতিও প্রদান করেন তিনি।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ