শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭

কুড়িগ্রামে যৌতুকের দাবীতে নির্যাতন গৃহবধু হাসপাতালে

অক্টোবর ৮, ২০১৭ 52 views 0
কুড়িগ্রামে যৌতুকের দাবীতে নির্যাতন গৃহবধু হাসপাতালে

খাজা ময়েনউদ্দিন চিশতি, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : কুড়িগ্রাম জেলার  চিলমারী উপজেলায় যৌতুকের দাবীতে স্বামীসহ শশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতন শিকার হয়ে দুই সপ্তাহ ধরে চিলমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ মাসের শিশু কন্যা রিসিকা জামান রোজকে নিয়ে মানবেতার দিন কাটছে এক গৃহবধুর। এ ঘটনায় চিলমারী থানা একটি এজাহার দাখিল করা হয়েছে।

 

নির্যাতনের স্বীকার সাবিনা ইয়াসমিন মুক্তা (২৫) জানান, ফেসবুকে পরিচয় হয় কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের খরখরিয়া গ্রামের লুৎফর রহমানের ছেলে রুকুনুজ্জামান রুকু (৩০)’র সাথে।

 

সাবিনা চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তপুর উপজেলার চৌরালা গ্রামের ইয়াসিন আলীর মেয়ে। ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসা করে তার বাবা। পরিচয়ের পর চিলমারীতে পালিয়ে এসে ২০১৫ সালের ২১শে জুলাই ১ লাখ ৫০ হাজার ১০১ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে হয় তাদের।

 

বিয়ের পর থেকে সাবিনার নিকট যৌতুক হিসেবে ৩/৪ লাখ টাকা ব্যবসা করার জন্য চেয়ে বসেন তার স্বামী। আর এই যৌতুকের জন্য প্রায় সময় সাবিনার উপর চলত শারিরিক ও মানুষিক নির্যাতন। বাবা-মাকে ছেড়ে পালিয়ে আসা সাবিনা নিরুপায় হয়ে সবকিছু সহ্য করে নেয়। যৌতুকের টাকার জন্য অতিরিক্ত চাপ দিলে সাবিনা তার মায়ের সাথে যোগাযোগ করলে তার মা ধারদেনা করে কয়েক দফায় স্বামী রুকুকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দেয়।

 

এরমধ্যে চলতি বছর ১৫ জানুয়ারিতে রিসিকা জামান রোজ জন্ম নেয়। সাংসারিক জীবনে প্রায় সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে টাকা নিয়ে কলহ লেগে থাকত। সর্বশেষ মোমবাতি তৈরির ব্যবসার জন্য যৌতুকের আরো আড়াই লাখ টাকা দাবী করলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় সাবিনা।

 

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তার স্বামী-ভাসুর-জা সহ কয়েকজন গত ২৪শে সেপ্টেম্বর রাতে বেধরক মারধর করে তাকে। পরের দিন সকালে আবার টাকার জন্য সাবিনাকে নির্মমভাবে নির্যাতন চালানো হয়। এসময় নিজের জীবন বাঁচাতে সাবিনা চিৎকার-মেচামেচি করলে প্রতিবেশিরা এসে গুরুত্বর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে চিলমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

 

হাসপাতালে ভর্তিরত রোগীর অভিভাবক জুঁই বেগম, ফাতেমা বেগম, হাসিনা বেগম বলেন, মেয়েটি দুধের সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছে এক কাপড়রেই। মেয়ের বাপের কিংবা শশুর বাড়ির লোকজন কেউ কোন খোঁজ খবর নিচ্ছে না। খুব কষ্টে এখানে আছে। অসুস্থ্য শরীর নিয়ে বাঁচ্চাকে সামলাতে পারেনা। আমরা আশপাশের মানুষজন তাকে খাওয়া থেকে শুরু করে বাঁচ্চাকে কোলে নিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করছি।

 

সাবিনার প্রতিবেশি প্রত্যক্ষদর্শী মঞ্জু মিয়ার স্ত্রী নুরীমা বেগম (৪৫), হালিমা বেগম (৪৮) জানান, ঘটনার দিন বৃষ্টি পড়ছিল সকাল বেলা গোঙ্গানীর শব্দ পেয়ে গিয়ে দেখি সাবিনার হাত-পা বেধে মুখে গামছা গুজে দিয়ে মারধর করছে ওর স্বামী-ভাসুর জাসহ বেশ কয়েকজন। পরে এলাকাবাসীকে খবর দিয়ে ওদের হাত থেকে মেয়েটি উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য নিয়ে যাই।

 

সাবিনার শশুর লুৎফর রহমান নির্যাতনের ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, সাবিনাকে কোন ধরনের নির্যাতন করা হয়নি। কথা কাটাকাটি হলেই মেয়েটি মাঝে মধ্যে আমাদেরকে হুমকি দিত আত্মহত্যা করব না হলে আপনাদের নামে মামলা করে দিব। পরে এবিষয়টি আমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে জানিয়ে রাখি।

 

সাবিনার ভাসুর মহসেনুল হক জানান, তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মাঝে মধ্যে ঝগড়া লাগত। ঘটনার দিন আমি ছিলাম না। কি জন্য তাদের মধ্যে বিবাদ লেগেছে আমার জানা নেই।

 

তবে তিনি বলেন, যৌতুকের জন্য তার ভাই তাকে নির্যাতন করেনি। এছাড়াও হাসপাতালে সাবিনার খোঁজখবর প্রসঙ্গে জানান নিয়মিত তারা খোজঁখবর রাখছেন।

 

এছাড়াও মেয়েটির উপর দোষ চাপিয়ে ঘটনা সাজানো এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও প্রতিবেশির ইন্ধন থাকার কথা বলেন।

 

ঘটনার পর থেকে রুকু পলাতকের বিষয়ে তিনি জানান, মানুষের চাপে পড়ে লুকিয়ে আছে। পরিবারের সাথে সে যোগাযোগ নিয়মিত হচ্ছে।

 

সাবিনার স্বামী রুকু মোবাইল ফোনে জানান, আমি কোন যৌতুকের জন্য তাকে নির্যাতন করিনি। মেয়েটি আমার সাথে প্রতারণা করে বিয়ে করেছে। আর স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা করে আমারকে ও আমার পরিবারকে হেনস্থা করা হচ্ছে।

 

হাসপাতালের ইনচার্জ সিনিয়র নার্স লতিফা বেগম বলেন, সাবিনাকে গুরুত্ব অবস্থায় কিছু মানুষ হাসপাতালে সকালে ভর্তি করে। তার শরীরে বিভিন্ন জায়গায় মারধর করার মত চিহ্ন ছিল। এছাড়াও তার যৌনাঙ্গে আঘাত করা হয়েছি।

 

এ ব্যাপারে রমনা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে মেয়েটির অভিভাবক এখানে কেউ থাকেনা। মেয়েটি ভর্তি থাকা এবং ওর স্বামী রুকু পলাতক থাকায় কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছেনা। প্রশাসনিকভাবে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা নেবার আশ্বাস দেন তিনি।

 

চিলমারী থানার অফিসার ইনচার্জ কৃঞ্চ কুমার সরকার জানান, সাবিনার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তার ভাসুর মহসেনুল হককে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • সবচেয়ে পঠিত

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ