সোমবার, ২১ আগষ্ট, ২০১৭

গণতন্ত্রের হত্যা বনাম গণতন্ত্রের বিজয়

জানুয়ারি ১১, ২০১৭ 75469 views 0
গণতন্ত্রের হত্যা বনাম গণতন্ত্রের বিজয়

সায়েক এম রহমান :

০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। আজ থেকে তিন বৎসর পূর্বে এই দিনটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভোটহীন, প্রার্থীহীন বিশ্ব স্বীকৃত একটি তামাশার নির্বাচন।

 

যে নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসন ই ছিল প্রার্থীশূন্য। বাকী ১৪৬টি আসনে ভোট পড়েছিল ৫% এর নিচে। কোন কোন কেন্দ্র ছিল না কোন ভোটার ই, অনেক কেন্দ্র দেখাগিয়েছিল নির্বাচনী কর্মকর্তারা নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন।

 

বিশ্বমিডিয়া সহ ফলাও করে প্রচার করেছিল। এই দিনটিকে বিএনপি ও ২০দলীয় জোট গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসাবে পালন করে আসছে। আর অপর দিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ এই দিনটিকে পালন করছে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসাবে।

 

আজ বাংলাদেশ সহ বিশ্বের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জাতীয়তাবাদী বাংলা ভাষাভাষীরা ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক দিনটাকে ঘৃণাভরে স্মরণ করে, বিশ্বের বড় বড় শহরে সভা সেমিনার ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এর মধ্যে লন্ডনের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের ১০ নং ডাউনিং ষ্ট্রীটের সামনে হাজার হাজার প্রবাসী নেতাকর্মী বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি প্রদান সহ বেলজিয়ামে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ ও নিউইয়র্কের জাতি সংঘের সদর দপ্তরের সামনেও  হাজার হাজার প্রবাসী নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

 

এদিকে শাসক দল প্রতিবারের মতন এইবারও কোন সভা সমাবেশের অনুমতি না দিয়ে বেপরোয়া আক্রমণ শুরু করলো। যখন গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে কালো পতাকা ধারণ ও মিছিল করতে যাচ্ছিল তখন দেশবাসী সেই বাকশালী কায়দায় আবারো দেখলো, নির্বিচারে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমীক লীগ এর হামলা, পুলিশের বেপরোয়া লাটিচার্জ, কাটাতারের বেড়া, রাবার বুলেট, জল কামান, ব্যাপক মারধর, আটক আহত ও রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষতের মাধ্যমে এদেশের মানুষের গণতান্ত্রীক অধিকারকে রুখে দিয়েই, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ পুলিশ প্রহরায় গণতন্ত্রের বিজয় দিবস পাল করছে, সমাবেশ করছে, মিছিল-মিটিং করছে, বিজয় উল্লাস করছে।

 

আজ পর্যবেক্ষক বলছেন এক দেশ, এক নাগরিক, কিন্তু আইন দুই। এক নাগরিক সবকিছু করতে পারবে আর আরেক নাগরিক কিছুই করতে দেয়া হবে না। অর্থাৎ এক নাগরিকের জন্য সব ই হালাল আর আরেক নাগরিকের জন্য সব ই হারাম। আরো বলছেন, এসব গণতন্ত্র তো আইয়ূব-ইয়াহিয়ার শাসনামলে আমরা দেখেছিলাম। এ জাতীয় গণতন্ত্র রক্ষা আইয়ূব-ইয়াহিয়ারাই করেছিল।

 

পাঠক, গত ৫ জানুয়ারীর গণতন্ত্র হত্যা দিবসের অনেকগুলি ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনা উল্লেখ করতেই হয়। ৫ জানুয়ারী সকাল ১১ ঘটিকায় বরিশাল বিএনপির প্রধান কার্য্যালয় থেকে নেতাকর্মীরা যখন কালো পতাকা মিছিল বাহির করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখন পুলিশ প্রহরায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীরা তাদের উপর লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করে। তাতে সংঘর্ষ বাধে এবং প্রায় ১১-১২জন মারাত্বক আহত হন।  এই আহতদের মধ্যে একজন ভদ্র মহিলা বরিশাল বিএনপির সহ শিক্ষা সম্পাদক আফরোজা খানম রুজি।

 

পুলিশ প্রহরায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীদের লাঠিসোটার হামলার স্বীকার বরিশাল বিএনপির সহ শিক্ষা সম্পাদক আফরোজা খানম রুজি

পুলিশ প্রহরায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীদের লাঠিসোটার হামলার স্বীকার বরিশাল বিএনপির সহ শিক্ষা সম্পাদক আফরোজা খানম রুজি।

 

তাকে যেভাবে মাটিতে ফেলে উপর্যূপরী পেটানো হলো। এটা কোন বর্বরতা? এটা কোন অমানুষিকতা? রাজনৈতিক আক্রমণ হতে পারে। তাই বলে একজন নারীর প্রতি এতগুলো মানুষের সহিংস আচরণ? আমরা যেন আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে বাস করছি। এসব কর্মকান্ড সেই ২৮ তারিখের লগি-বৈটার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর নাম কি গণতন্ত্রের বিজয়?

 

একজন নারী রাজনৈতিক কর্মীকে এভাবে রাস্তায় ফেলে পেটানো হলো অথচ তার কোন প্রতিবাদ নেই, নেই কোন প্রতিক্রিয়া। কোন গণমাধ্যমে ও আলাদা কোন প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। নারী বাদীরা আজ কোথায়? হায়রে গণতন্ত্র, হায়রে গণতন্ত্রের বিজয়।

 

এ যেন- — – – – এক বেপারী কোন কারণে লজ্জা পেয়ে পরনের লুঙ্গী দিয়ে মুখ ডাকার চেষ্টা করেছিল। অতপর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি এমন করলেন কেন? বেপারী বললেন আমি শরম পেয়ে মুখ ডেকেছি। নিচের অংশ উলঙ্গ হয়ে গেলো সে খবর নাই। সাধারণ মানুষ এখন বলছে, আজকের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের বিজয় পালন করতে গিয়ে যে উলঙ্গ হয়ে গেলো সে খবর রাখে কি?

 

পাঠক, গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক মিছিল, মিটিং সভা-সমাবেশ এমনকী মানবন্ধর পর্যন্ত পন্ড করে দিয়েছে শাসক দল। শুধু পন্ড ও ভন্ডুল করে শেষ নয় সরকারী মাস্তানদের ওপেন হামলা, পুলিশের লাটি চার্জ গুলি ছোড়া সহ প্রায় অর্ধ শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী আহত এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। বিশেষ করে বরিশাল, নারায়নগঞ্জ, নওগাঁ, ব্রাক্ষ্মন বাড়ীয়া, ময়মনসিংহ, নরসিংদী ও সিলেটে পুলিশ ও যুবলীগ ছাত্রলীগের হামলায় শান্তিপূর্ণ কালো পতাকা মিছিল পন্ড হয়ে যায়।

 

আজ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলছেন, আইয়ূব-ইয়াহিয়ার শাসন ও শোষনের গণতন্ত্র, সত্তর দশকের বাকশালী এক দলীয় গণতন্ত্র, স্বৈরাচার এরশাদের স্বৈরতান্ত্রীক গণতন্ত্র, এসব গণতন্ত্রের হার মনে গেছে বর্তমান সরকারের বাকশালী গণতন্ত্রের কাছে।

 

আজ শুধু গণতন্ত্রকে হত্যা নয়, গণতন্ত্রকে ধর্ষন করে হত্যা করা হচ্ছে। দেশ আজ গণতন্ত্র শূন্য। শূন্য গণতন্ত্রে দেশের সার্বভৌমত্ব আজ বিভিন্নভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন।

 

পাঠক এখানে বিস্তারিত লেখা সম্ভব নয়। শুধু বলবো, আমরা নিজ দেশের ব্রীজের উপর দিয়ে যেতে টোল দিই ৭ থেকে৮শত টাকা। আর ভারত আমার দেশের বুকের উপর দিয়ে যেতে লাগে মাত্র ১৯২ টাকা। এ কোন পররাষ্ট্র নীতি? এ কোন গোলামীর জিঞ্জির?

 

আমরা সবাই জানি শিক্ষা হলো, ‘একটি জাতির উন্নয়নের চাবিকাটি’। কিন্তু আজ আমাদের শিক্ষাক্ষেত্র ধ্বংস লীলায় পরিণত। স্বয়ং আওয়ামীপন্থী লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ জাফর ইকবাল-ই বললেন, এখন জি পি এ ৫ এর কোন মূল্য নেই। কারণ ছাত্ররা জি পি এ ৫ পেয়েও সাধারণ পরিক্ষায়ও পাশ করতে পারছে না। শিক্ষার মান নিয়ে আমরা আজ সর্বনিম্ন পৌছে গেছি।

 

এইতো সেদিন বিজয় দিবস পালনকালে, টিভি সাংবাদিক নতুন প্রজন্মের অনার্স ও মাস্টার্স করা ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ‘বিজয় দিবস’ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে, তারা কেউ বললেন, বিজয় দিবস মানে শোক দিবস, কেউ বললেন স্বাধীনতা দিবস, আবার কেউ বললেন আমরা এখনকার ছাত্ররা ইতিহাস তেমন পড়তে হয় না। এই হলো আমাদের বর্তমান উন্নয়নের রোল মডেল বা উন্নয়নের জোয়ার।

 

এছাড়া খুন গুমের হরিলুট, পিল খানা ট্রাজেডি, একের পর এক ফাঁসিতে ঝোলানো, ক্রস ফায়ারের বিশালতা, জঙ্গী হামলার বিভিন্ন নাটক এখানেই শেষ নয়, রাষ্ট্র সম্পদ ও বিভিন্নভাবে হরিলুটে নিমজ্জিত। ব্যাংক ডাকাতি থেকে শুরু করে শেয়ার বাজার, ডেসটিনি, হলমার্ক, সোনালী, রুপালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারী সহ রাষ্টায়াত্ব ব্যাংকগুলির হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা। আর এই লুটের টাকাগুলি উড়ছে বিশ্বের মেগা সিটির পাঁচ তারাঁ, সাঁত তাঁরা হোটেলে হোটেলে।

 

এদিকে সুন্দরবনে রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে শতকরা ৯০ভাগ বাংলাদেশের ক্ষতি জেনেও সরকার রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণে উদগ্রীব। কারণ তাদেরকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য  এবং ভারতের সাথে সম্পর্ক গাঢ় রাখার জন্য।

 

তাই বলছি, শাসক দল শুধু গণতন্ত্রকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয় নাই। ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য নিজ দেশের সার্বভৌমত্বকে বিভিন্নভাবে বিক্রি করে দিচ্ছে। আজ গোটা বাংলাদেশ ধ্বংসলীলায় পরিণত।

 

পাঠক অবশ্য অবগত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের পর ২২জুলাই ২০১৪ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন হতাশার কথা প্রকাশ করেছিলেন।

 

ঐ সময় আলোচনায় গণতান্ত্রীক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা স্থান পায় এবং এখন একটা মুক্ত সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বের প্রশ্নে একমত হন দুই প্রধানমন্ত্রী। তারই দুই মাস পর ১৭ অক্টোবর ২০১৪ ‘৫ই জানুয়ারী’র নির্বাচনের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে হতাশা প্রকাশ করে ব্রিটেন।

 

এছাড়া বাংলাদেশে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়াস স্টিপেন্স ব্লম বার্ণিকাট যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র বিষয়ক সিনেট কমিটির সামনে বাংলাদেশ বিষয়ে তার বক্তব্যে বলেছিলেন ৫ই জানুয়ারীর সংসদ নির্বাচন নিঃসন্দেহে ক্রুটিপূর্ণ ছিল এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো জরুরী ভিত্তিতে গঠনমূলক সংলাপে অংশগ্রহণ করা দরকার। যাতে আরো প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। ইউরোপিয় ইউনিয়ন ও উপরোক্ত বিষয়ে একমত প্রকাশ করেছিল।

 

আর এদিকে সেদিন আওয়ামী লীগের ২০তম কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন আগামী দিনের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করলে চলবে না। তাহার এই কথাটির মধ্যে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন সহ তাহার অধিনের সব নির্বাচন গুলোই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

 

এছাড়া জনগণ অবগত ৫জানুয়ারী নির্বাচন পূর্বে শেখ হাসিনা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সাংবিধানিক আইন রক্ষার জন্য এই নির্বাচনটা করছেন। নির্বাচন পর সবাইকে নিয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে শীঘ্রই আরেকটি নির্বাচন দিবেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এদতসত্বেও দেশবাসী আজ গণতন্ত্রের বিজয় বিজয় উদযাপন করতে দেখছে।

 

পাঠক, আজ কিন্তু আওয়ামী লীগকে ভাবা উচিত। কারণ আওয়ামী লীগ উপমহাদেশে একটি প্রাচীনতম দল। যে দল ৫২, ৬৯, ৭০, ৭১ এর নেতৃত্ব দানকারী দল। যে দল আইয়ূব-ইয়াহিয়ার কাছ থেকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছে। সেই দলই আজ গণতন্ত্রকে ধর্ষন করে হত্যা করছে। আজ মানুষ বাকরুদ্ধ। সেই আওয়ামী লীগ আর আজকের শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আকাশ পাতাল ব্যবধান হয়ে গেছে।

 

তাই শাসক দলকে বলছি, অর্জিত গণতন্ত্রটুকু নস্যাৎ না করে, দেশকে পরাধীন ও ধ্বংসলীলা না বানিয়ে, ষোল কোটি মানুষের দিকে তাকিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন চলাকালীন সময়ের জন্য, একটি গ্রহণযোগ্য সরকার গঠন করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিয়ে যদি দেশ ও জাতিকে বাঁচান, তাহলে প্রাচীনতম দল আওয়ামী লীগ ও বেঁচে যাবে। নইলে এ দেশ ও জাতি লড়বেই লড়বে। আর তখন আওয়ামী লীগ পতিত হবে গহীন গহব্বরে।

 

সায়েক এম রহমান

সায়েক এম রহমান

লেখক :

সায়েক এম রহমান
লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক

sayakurrahman@hotmail.com

.

.

***এখানে প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব, প্রথম নিউজের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভুক্ত নয়।***

 

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • সবচেয়ে পঠিত

জনমত জরিপ

অং সাং সু চির নোভেল পুরুষ্কার প্রত্যাহার করার জন্য আপনারা কি একমত ?

View Results

Loading ... Loading ...
ব্রেকিং নিউজ